ইসলাম একটি সুখী ও আদর্শ পরিবার গঠনের জন্য স্বামী-স্ত্রীর জন্য সুনির্দিষ্ট অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে। এখানে দাম্পত্য জীবন কেবল আইনি চুক্তি নয়, বরং মায়া-মমতা ও ত্যাগের পবিত্র বন্ধন। বিশেষ করে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব পালনই গৃহের শান্তি ও সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।
স্বামীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো স্ত্রীকে ইবাদত-বন্দেগিতে উৎসাহিত করা এবং ধর্মীয় জ্ঞানার্জনে সাহায্য করা। তাকে প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল শেখানো বা জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া তার কর্তব্য। মহানবী (সা.) নারীদের মসজিদে গিয়ে জ্ঞানার্জনের অনুমতি দিয়েছিলেন। আয়েশা (রা.) বলেন, “ইমানদার নারীরা নবীজির সঙ্গে চাদর মুড়ি দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করতেন এবং নামাজ শেষে অন্ধকারের মধ্যেই ঘরে ফিরে যেতেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৭৮)
স্ত্রীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার ও সুন্দর আচরণ করা স্বামীর বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবন অতিবাহিত করো।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১৯) মহানবী (সা.) বলেছেন, “মুমিনদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই পূর্ণাঙ্গ ইমানদার, যার চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর; আর তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১১৬২)
স্ত্রীর অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের সংস্থান করা স্বামীর আইনি ও ধর্মীয় দায়িত্ব। তবে এই ব্যয় হবে সামর্থ্য অনুযায়ী। মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন, “উত্তম পন্থায় তাদের অন্ন ও বস্ত্রের সংস্থান করা তোমাদের ওপর অপরিহার্য।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮) এমনকি পরিবারের পেছনে ব্যয় করা অর্থকেও ইসলামে ‘সদকা’ বা দান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫)
দাম্পত্য জীবনে উভয় পক্ষই শারীরিক ও মানসিক অধিকারের দাবিদার। সন্তান লাভ ও বংশবিস্তার শরিয়তের অন্যতম উদ্দেশ্য। মহানবী (সা.) অধিক সন্তানদানকারী নারীদের বিয়ের পরামর্শ দিয়েছেন যেন কিয়ামতের দিন উম্মতের সংখ্যাধিক্য নিয়ে তিনি গর্ব করতে পারেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১২৬১৩)
স্ত্রীর মর্যাদা ও আত্মসম্মানে আঘাত হানে এমন কাজ থেকে স্বামীকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে বিবাদ বা মনোমালিন্যের সময় স্ত্রীকে গালমন্দ করা বা চেহারায় আঘাত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। জনৈক ব্যক্তি নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের ওপর স্ত্রীর হক কী? তিনি বললেন, “তুমি যখন খাবে তাকেও খাওয়াবে, তুমি যখন পোশাক পরবে তাকেও পরাবে; চেহারায় আঘাত করবে না, গালি দেবে না এবং ঘরের বাইরে তাকে একা ফেলে রাখবে না।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২১৪২)
স্ত্রীর একঘেয়েমি দূর করতে তার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করা এবং মাঝেমধ্যে চিত্তবিনোদনের সুযোগ করে দেওয়া সুন্নাহর অংশ। হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে নবীজির দৌড় প্রতিযোগিতা বা উৎসবের দিনে হাবশিদের খেলা দেখার ঘটনাগুলো এর উজ্জ্বল প্রমাণ। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৫৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৯২)
অনেক পুরুষ ঘরের কাজকে কেবল স্ত্রীর দায়িত্ব মনে করেন, যা ভুল। মহানবী (সা.) নিজের ঘরের কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করতেন। হজরত আয়েশাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নবীজি ঘরে কী করতেন? তিনি বলেন, “তিনি ঘরের কাজে পরিবারের ব্যস্ত থাকতেন; অর্থাৎ তাদের সেবা ও সাহায্য করতেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৬)
স্ত্রীকে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে ও সদাচরণ করতে বাধা দেওয়া স্বামীর উচিত নয়। বরং স্ত্রীকে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষায় উৎসাহিত করা তার দায়িত্ব। সুরা বনি ইসরাইলে আল্লাহ–তাআলা বাবা-মায়ের প্রতি ইহসানের যে নির্দেশ দিয়েছেন (আয়াত: ২৩)। সুতরাং তা পালনে স্ত্রীকে সহযোগিতা করা স্বামীর নৈতিক দায়িত্বের অংশ।






