পণ্য উৎপাদনে জোর করে শ্রম ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং উৎপাদন খাতের সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক তদন্ত শুরু করেছে। ২৮ এপ্রিল জোর করে শ্রমের বিষয়ে শুনানি শুরু হবে, আর ৫ মে উৎপাদন খাতের সক্ষমতা নিয়ে তদন্তের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
এই শুনানিগুলোর জন্য তিন সপ্তাহও বাকি থাকতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখনো বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কোনো বৈঠক করেনি। এমনকি মার্কিন দুই তদন্তের সঙ্গে জড়িত খাতের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর কাছ থেকে কোনো তথ্য সংগ্রহও করা হয়নি। ফলে শুনানিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তুতি যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমাদের প্রস্তুতি পুরোপুরি আছে। ইউএসটিআর বিষয়টি নিয়ে ই–মেইল করেছে। আমরা জবাব দিয়েছি। তবে ইউএসটিআরের মেইলে তদন্তের বিষয়টি উল্লেখ ছিল না। চলতি সপ্তাহে ইউএসটিআরের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক করব।”
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বাজারে ৮৬৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা মোট পণ্য রপ্তানির ১৮ শতাংশ। গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বসান। চলতি বছর সেটি কমে ১৯ শতাংশ হয়। ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে পাল্টা শুল্ক আরোপকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মাথায় নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। পরদিন সেই শুল্ক বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়, যা ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে।
সিমেন্টের ব্যবসা মূলত মৌসুমি। কয়েক মাস ব্যবসা হয়। এখানে অতিরিক্ত উৎপাদনের কোনো সুযোগ নেই। বাজারে অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতার কোনো অভাব নেই।মো. আমিরুল হক, সভাপতি, বিসিএমএ
যুক্তরাষ্ট্রের দুই তদন্ত
গত ১১ মার্চ উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর ইউএসটিআর জানায়, তদন্তে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতি, পদক্ষেপ বা উৎপাদনকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক কি না, সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূলত তৈরি পোশাক ও সিমেন্ট খাতের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটি তদন্ত করবে যুক্তরাষ্ট্র।
তদন্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বিবৃতিতে বলেছিলেন, অন্য দেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র নিজের শিল্প সক্ষমতা বিনষ্ট হতে দেবে না; অর্থাৎ এমন পরিস্থিতি তারা আর মেনে নেবে না, যেখানে অন্য দেশগুলো তাদের অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঠেলে দেবে। তাঁর মতে, এ তদন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শিল্প খাত পুনরুজ্জীবন নীতির অংশ।
এ ছাড়া গত ১২ মার্চ পণ্য উৎপাদনে জোর করে শ্রম বন্ধে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশ যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে দেশগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর জানায়, পণ্য উৎপাদনে জোর করে শ্রমের ব্যবহার থাকলে সেই পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ কতটা যুক্তিযুক্ত বা বৈষম্যমূলক। একই সঙ্গে যাচাই করা হবে, এসব নীতি বা অনুশীলন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর কোনো ধরনের বোঝা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে কি না।
তৈরি পোশাকশিল্পে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নেই। তা ছাড়া জোর করে শ্রমের সুযোগ নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত তথ্য–উপাত্তভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করা।মাহমুদ হাসান খান, সভাপতি, বিজিএমইএ
তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান গত সপ্তাহে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নেই। তা ছাড়া জোর করে শ্রমের সুযোগ নেই। শ্রম অধ্যাদেশ আইন আকারে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত তথ্য–উপাত্তভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরি করা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো বৈঠক করেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো কোনো বৈঠক করেনি। এখনো সময় আছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমাদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করবে বলে আমরা আশা করছি।
সিমেন্ট খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন নেই বলে জানালেন দেশের সিমেন্ট শিল্পের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) সভাপতি মো. আমিরুল হক। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সিমেন্ট ব্যবসা মূলত মৌসুমি। কয়েক মাস ব্যবসা হয়। এখানে অতিরিক্ত উৎপাদনের কোনো সুযোগ নেই। বাজারে অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ফলে প্রতিযোগিতার কোনো অভাব নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মার্কিন দুই তদন্তের শুনানিতে উপস্থাপনের জন্য পজিশন পেপার বা অবস্থানপত্র তৈরি করতে গতকাল সোমবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ, বস্ত্রকলের মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ এবং জুতা ও চামড়াপণ্য রপ্তানিকারী মালিকদের সংগঠন এলএফএমইএবির প্রতি চিঠি ইস্যু করেছে। দুই দিনের মধ্যে তাদের মতামত পাঠাতে বলা হয়েছে।
চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, কিছুটা দেরিতে হলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, আমরা ভালো প্রস্তুতি নিয়ে শুনানিতে অংশ নেব।






