দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের তীব্র অভাব দেখা দিয়েছে। এখন অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয়ে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই, ফলে পাঠদান এবং প্রশাসনিক তদারকি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি ও মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৬৫ হাজার ৪৫৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৩৪ হাজার ১৫৯টি প্রধান শিক্ষকের পদই শূন্য। বিধিমালা সংশোধন করা গেলেও আইনি জটিলতায় পদোন্নতি প্রক্রিয়া আটকে থাকায় এই বিশাল শূন্যতা কমছে না।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক পদের মোট শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং বাকি ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করতে হবে। গত বছর এই বিধিমালা চূড়ান্ত হলেও একটি চলমান মামলার কারণে পদোন্নতিযোগ্য পদের জট খুলছে না। ফলে হাজার হাজার যোগ্য সহকারী শিক্ষক সব শর্ত পূরণ করেও পদোন্নতি পাচ্ছেন না।
এই সংকট নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে প্রধান শিক্ষক পদের একটি বড় অংশ খালি রয়েছে। আমাদের নীতি অনুযায়ী, এই পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হবে। সহকারী শিক্ষক থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি আমাদের নিয়মিত প্রক্রিয়ার মধ্যেই আছে।’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘মূলত একটি আইনি জটিলতা বা আদালতের মামলার কারণে পদোন্নতি প্রক্রিয়াটি কিছুটা থমকে আছে। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই আদালতের মামলার নিষ্পত্তি হবে। মামলার জট খুললেই আমরা বড় আকারে পদোন্নতি দিতে পারব। এই সংকট সমাধানে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং দ্রুতই এর সমাধান হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
বর্তমানে ৩৪ হাজার ১৫৯টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় কয়েক কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা তদারকিতে ঘাটতি পড়ছে। এর বিপরীতে পিএসসির মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগের জন্য মাত্র ১ হাজার ১২২টি পদের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এই সামান্য পদের জন্য প্রায় সাত লাখ চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেছেন, অর্থাৎ গড়ে প্রতি পদে ৬২৪ জন লড়বেন। গত বছরের অক্টোবরে আবেদন শেষ হলেও পরীক্ষার তারিখ এখনও নির্ধারিত হয়নি।
পিএসসি জানিয়েছে, বিশাল আবেদনকারীর পরীক্ষা আয়োজন একটি বড় কারিগরি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ১ হাজার ১২২টি পদ পূরণ হলেও মূল সমস্যা থাকবে যদি পদোন্নতির ৮০ শতাংশ কোটা না চলে।
গত বছরের নতুন বিধিমালা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির জন্য সহকারী শিক্ষক হিসেবে অন্তত ১২ বছরের অভিজ্ঞতা, মৌলিক প্রশিক্ষণ ও চাকরি স্থায়ীকরণ বাধ্যতামূলক। সারা দেশে কয়েক হাজার সহকারী শিক্ষক এই যোগ্যতা পূরণ করেছেন, কিন্তু আদালতের একটি মামলার স্থগিতাদেশে পদোন্নতির আদেশ দেওয়া যাচ্ছে না।
অনেক বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকরা ‘ভারপ্রাপ্ত’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে তাঁদের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে এবং স্থায়ী না হওয়ায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবং চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে দ্রুত এই জট খোলা জরুরি।






