প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গত শনিবার (৪ এপ্রিল) দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের বৈঠকে ‘বেসরকারি খাত উপদেষ্টা পরিষদ’ বা ‘প্রাইভেট সেক্টর অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল’ গঠন নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) পরে জানায়, সেই বৈঠকে কোনো আনুষ্ঠানিক কাউন্সিল বা কমিটি গঠন করা হয়নি।
বৈঠকে দেশের বিভিন্ন খাতের ৯ জন ব্যবসায়ী অংশগ্রহণ করেন। প্রথমে বিডার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী এই পরিষদ গঠন করেছেন এবং সভায় সভাপতিত্ব করেছেন। পরে বিডা সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ‘কাউন্সিল গঠন’ের উল্লেখ বাদ দেয়। এতে জানানো হয়, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের সংলাপের অংশ হিসেবে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিডার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ‘বেসরকারি খাত উপদেষ্টা পরিষদ’ নামে আনুষ্ঠানিক কোনো কমিটি বা পরিষদ গঠন করা হয়নি। যদিও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার জন্য এই ফোরাম কার্যকর; তবে এর আইনি ভিত্তি (সরকারি গেজেট বা প্রজ্ঞাপন) না থাকায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে নামটি প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ঘটনার ধারাবাহিকতা
বিনিয়োগ প্রক্রিয়া গতিশীল করতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে বিডা ৩২ দফা সংস্কার প্রস্তাব করে। এর মধ্যে ছিল বেসরকারি খাত উপদেষ্টা পরিষদ গঠন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এতে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিএনপি সরকার গঠনের পর বিডা প্রস্তাবটি পুনরায় সরকারের কাছে তুলে ধরে।
গত ৩১ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে প্রাইভেট সেক্টর অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের (পিএসএসি) প্রথম সভা ৪ এপ্রিল সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হবে—এ কথা উল্লেখ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক-১ ফাহমিদ ফারহান স্বাক্ষরিত চিঠিতে ৯ ব্যবসায়ীর নামও দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোট ১১ সদস্যের এই পরিষদের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সদস্যসচিব বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। বাকি ৯ সদস্য—এসিআইয়ের এমডি আরিফ দৌলা, এপেক্স ফুটওয়্যারের এমডি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী, বে গ্রুপের এমডি জিয়াউর রহমান, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের এমডি আবদুল মুক্তাদির, ডিবিএল গ্রুপের এমডি আবদুল জব্বার, র্যাংগস গ্রুপের এমডি সোহানা রউফ চৌধুরী ও প্যাসিফিক জিনসের এমডি সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর।
শনিবার সভায় প্রধানমন্ত্রী সভাপতিত্ব করেন। সভা শেষে বিডা ‘দেশের প্রথম বেসরকারি খাত উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান’ শিরোনামে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। এটি বিডার হোয়াটঅ্যাপ গ্রুপ ও ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়।
সমালোচনা, বিডার বক্তব্য বদল
বিডার বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করে গণমাধ্যমগুলো সংবাদ প্রকাশ করে। কিন্তু পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া ও সদস্য বাছাই মানদণ্ড নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।
শনিবার রাত ৮টা ১৫ মিনিটের দিকে বিডা ‘বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক’ শিরোনামে নতুন বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে বক্তব্য বদলায়। এতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শীর্ষস্থানীয় বৈঠকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেন; তারা ব্যবসা-বিনিয়োগ পরিবেশ ও সংস্কার নিয়ে মতামত দিয়েছেন।
নতুন বিজ্ঞপ্তিতে ‘প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক বেসরকারি খাত উপদেষ্টা পরিষদ গঠন’ বা সদস্য নির্বাচনের উল্লেখ বাদ দেওয়া হয়। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানের বক্তব্য থেকেও সংশ্লিষ্ট অংশ মুছে ফেলা হয়। ফেসবুক পেজ থেকে প্রথম বিজ্ঞপ্তি মুছে দেওয়া হয়।
শনিবার রাত ১১টার দিকে বিডার ফেসবুক পেজে আরেকটি বিবৃতি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ‘লক্ষ করা গেছে, এ (বৈঠকের) বিষয়ে কিছু বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। স্পষ্ট করা যাচ্ছে যে বৈঠকটি সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর কোনো আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টা পরিষদ নয়। এটি কোনো সাংগঠনিক বা আইনি ভিত্তির প্রেক্ষিতে করা হয়নি। ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।’
যে ব্যাখ্যা পাওয়া গেল
বিডার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যখন কোনো বৈঠকে বসেন, তখন গেজেট হওয়া ছাড়া “কাউন্সিল” শব্দটি আইনি পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। যেহেতু এই ফোরামের গেজেট এখনো প্রক্রিয়াধীন, তাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, আপাতত এই শব্দ ব্যবহার না করতে। এ কারণেই পরবর্তী সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শব্দটি প্রত্যাহার বা সংশোধন করা হয়েছে।’
বৈঠকে উপস্থিত ব্যবসায়ীদের বাছাইপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব সিদ্ধান্ত। বিডার পক্ষ থেকে ৩০–৩৫ জন ব্যবসায়ীর প্রাথমিক তালিকা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল। ওই তালিকা থেকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বাছাই করেছেন, তিনি ঠিক কাদের সঙ্গে বসতে চান।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের প্রকাশনায় “অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল” শব্দটির ব্যবহারের কারণে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট করা প্রয়োজন, এটি কোনো আইনগতভাবে গঠিত কাউন্সিল বা বোর্ড নয়; বরং এটি একটি পরামর্শভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম, যার উদ্দেশ্য উন্মুক্ত ও গঠনমূলক সংলাপকে এগিয়ে নেওয়া।’






