অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে লগইন করা এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু পাসওয়ার্ড মনে রাখা বা ম্যানেজ করার ঝক্কি এড়ানো সবসময় সহজ নয়। ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ফেস স্ক্যানের মতো বায়োমেট্রিক পদ্ধতিও নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে আসে। এই সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞানীরা একটি নতুন পথ খুঁজে পেয়েছেন—ব্যবহারকারীর অজান্তে মাথার খুলির ভিতর তৈরি কম্পনের সাহায্যে লগইন।

‘ভাইটাল-আইডি’ নামক এই প্রযুক্তি বিশেষ করে ভার্চুয়াল জগতের অভিজ্ঞতা বা ‘ইমারসিভ ডিজিটাল এক্সপেরিয়েন্স’-এ লগইন প্রক্রিয়ায় বিপ্লব আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাসওয়ার্ড টাইপ বা মুখ স্ক্যানের পরিবর্তে শরীরের সূক্ষ্ম নড়াচড়াই এখন যথেষ্ট। নিউ জার্সি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, টেম্পল ইউনিভার্সিটি এবং টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটির গবেষকরা যৌথভাবে এই গবেষণা করে থাকেন। এটি শ্বাসপ্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দনের কারণে উৎপন্ন কম্পনকে কাজে লাগায়, যা ঘাড় দিয়ে মাথার খুলিতে পৌঁছে। প্রত্যেকের হাড়ের গঠন ও টিস্যু ভিন্ন হওয়ায় এই কম্পনও ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতোই অনন্য।

২০২৫ সালের এসিএম কনফারেন্স অন কম্পিউটার অ্যান্ড কমিউনিকেশনস সিকিউরিটিতে এই সিস্টেম প্রথম উপস্থাপিত হয়। এটি মূলত ‘এক্সটেন্ডেড রিয়েলিটি’ বা বর্ধিত বাস্তবতার জন্য তৈরি। গবেষকদের মতে, কোনো অতিরিক্ত হার্ডওয়্যার লাগে না; আধুনিক হেডসেটের মোশন সেন্সরই যথেষ্ট। রুটগার্স ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার প্রকৌশলী ইয়িনইয়িং চেন বলেন, “আমাদের কোনো অতিরিক্ত ডিভাইস বা হার্ডওয়্যারের প্রয়োজন নেই। এটি চালানোর জন্য কেবল সফটওয়্যারই যথেষ্ট।”

এক্সটেন্ডেড রিয়েলিটি কী

এক্সটেন্ডেড রিয়েলিটি বা সংক্ষেপে ‘এক্সআর’ হলো ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, অগমেন্টেড রিয়েলিটি এবং মিক্সড রিয়েলিটির সমন্বয়। এটি বাস্তবের সঙ্গে ডিজিটাল উপাদান যুক্ত করে। সাধারণত ভাইচার, মেটা কোয়েস্ট ও অকুলাস রিফ্টের মতো গেমিং প্ল্যাটফর্মে এটি ব্যবহৃত হয়। তবে স্বাস্থ্যসেবা, অর্থায়ন, শিক্ষা ও দূরবর্তী কর্মস্থলে এর প্রয়োগ বাড়ছে। অধ্যাপক চেন বলেন, এক্সটেন্ডেড রিয়েলিটি আমাদের ভবিষ্যতে বড় ভূমিকা পালন করবে। যদি ইমারসিভ সিস্টেমগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে যায়, তবে এর নিরাপত্তাব্যবস্থা হতে হবে নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও সহজসাধ্য।

যেভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে

গবেষকরা ১০ মাস ধরে ৫২ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর দুটি জনপ্রিয় এক্সআর হেডসেট ব্যবহার করে ভাইটাল-আইডি পরীক্ষা করেন। ফলাফল উল্লেখযোগ্য—৯৫ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে সঠিক ব্যবহারকারী শনাক্তকরণ এবং ৯৮ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে অননুমোদিত প্রবেশ রোধ। তারা একটি ফিল্টারিং সিস্টেম তৈরি করেছেন যা মাথা নাড়া বা শরীরের অবস্থান পরিবর্তনের মতো বড় নড়াচড়া থেকে মুক্ত রাখে এবং শ্বাস-হৃৎস্পন্দনের সূক্ষ্ম কম্পন গ্রহণ করে। কম্পিউটার মডেলে দেখা গেছে, এই নড়াচড়া হুবহু নকল করা অত্যন্ত কঠিন। অন্যের শ্বাস-প্রশ্বাস নকল করলেও খুলির মাধ্যমে কম্পনের প্রবাহ একই রকম করা জটিল।

এক্সআর-এর প্রসারের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক লেনদেন বাড়ছে। হাতের ইশারায় পাসওয়ার্ড বা টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন মনোযোগ নষ্ট করে। ভাইটাল-আইডি ব্যাকগ্রাউন্ডে কোনো অতিরিক্ত ইনপুট ছাড়াই কাজ করে। প্রযুক্তিটি এখনো বাণিজ্যিকভাবে আসেনি। এটি লাইসেন্স প্রদান ও গবেষণা সহযোগিতার জন্য উন্মুক্ত এবং প্রভিশনাল পেটেন্টের আবেদন করা হয়েছে।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস