প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইংয়ের নিচে জরুরি পরিস্থিতির জন্য নির্মিত একটি ভূগর্ভস্থ বাংকারের বিষয় তুলে ধরেছেন। সাধারণত এ ধরনের স্থাপনার বিস্তারিত তথ্য গোপন রাখা হয়, কিন্তু বলরুম নির্মাণের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে তিনি এর বিশদ বর্ণনা দিচ্ছেন।
৪০ কোটি ডলার ব্যয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পিত ৯০ হাজার বর্গফুটের বলরুম নিয়ে জনমনে কৌতূহল থাকলেও, এর ভূগর্ভস্থ অংশটি প্রকল্পের সবচেয়ে জটিল ও ব্যয়বহুল অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে শ্রমিকরা সেখানে খননকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। মূলত ‘প্রেসিডেনশিয়াল ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার’ বা পিইওসি ভেঙে আরও বড়, উন্নত ও গভীরতর বাংকার নির্মাণের লক্ষ্যে এই কাজ চলছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের সুরক্ষার জন্য এই বাংকার তৈরি হয়েছিল। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার পর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনিকে দ্রুত এখানে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দলও এখানে আশ্রয় নেন। ২০২০ সালে জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের জেরে বিক্ষোভের সময় ট্রাম্পকেও এই বাংকারে আশ্রয় নিতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করে থাকে সিক্রেট সার্ভিস। সংস্থাটি আদালতে দুবার নথিপত্র জমা দিয়ে বলরুম প্রকল্পটি সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে।
গত বছর ট্রাম্প বলরুম তৈরির পথ প্রশস্ত করতে ইস্ট উইং ভেঙে ফেলেন। সাধারণত এই ভূগর্ভস্থ স্থাপনা গোপন রাখা হয়, কিন্তু বলরুম নির্মাণ নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ায় ট্রাম্প খোলামেলা কথা বলছেন। তাঁর যুক্তি, বলরুম ও বাংকার একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাই নিরাপত্তার খাতিরে বলরুম নির্মাণ জরুরি।
গত রোববার এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচক্রে ট্রাম্প বলেন, ‘সামরিক বাহিনী বলরুমের নিচে একটি বিশাল কমপ্লেক্স তৈরি করছে। বর্তমানে সেটির নির্মাণকাজ চলছে। আমরা খুব ভালোভাবেই এগোচ্ছি।’ তাঁর বর্ণনায়, এতে বোমার আঘাত প্রতিরোধক আশ্রয়স্থল (বোম্ব শেল্টার), হাসপাতালসহ ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসার সুবিধা’, সর্বাধুনিক গোপন যোগাযোগব্যবস্থা ও জৈব অস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা থাকবে।
ট্রাম্প আরও বলেন, ওপরের বলরুম ড্রোন, গুলি ও অন্যান্য হামলা থেকে বাংকার রক্ষা করবে। তাঁর ভাষায়, এতে উচ্চমানের বুলেটপ্রুফ গ্লাস থাকবে, সব জানালাই বুলেটপ্রুফ হবে। গত সপ্তাহে মন্ত্রিসভা বৈঠকে তিনি বলেন, ‘অন্য যেকোনো পক্ষের চেয়ে সামরিক বাহিনীই এটি বেশি চেয়েছিল।’
চলতি সপ্তাহে একজন বিচারক কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রকল্প স্থগিত করেন। ওয়াশিংটনের ফেডারেল ডিস্ট্রিক্ট কোর্টের বিচারক রিচার্ড জে লিওন তাঁর আদেশে লিখেছেন, ‘যতক্ষণ না কংগ্রেস সংবিধিবদ্ধভাবে এই প্রকল্পের অনুমোদন দিচ্ছে, ততক্ষণ নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে হবে!’ তিনি প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময় নিযুক্ত। ট্রাম্প এর বিরুদ্ধে আপিলের নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিচারকের আদেশের এক অংশ তুলে ধরেছেন, যেখানে ‘হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্মাণকাজ’ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এই সপ্তাহে ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমাদের পুরোপুরি জৈব প্রতিরক্ষা (বায়োডিফেন্স) ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের পুরোপুরি সুরক্ষিত টেলিযোগাযোগ ও যোগাযোগব্যবস্থা আছে। আমরা বোমার আঘাত প্রতিরোধক আশ্রয়স্থল তৈরি করছি। আমরা একটি হাসপাতাল ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসার সুবিধা তৈরি করছি। আমাদের এই সবকিছু আছে। তাই এর অর্থ হলো, আমি নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতিপ্রাপ্ত।’
সিক্রেট সার্ভিস আদালতে দুবার নথি জমা দিয়ে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা জানিয়েছে। সংস্থার উপপরিচালক ম্যাথিউ সি কুইন গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে লিখেছেন, প্রকল্প স্থগিত হলে জীবনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি জানান, সিক্রেট সার্ভিস নিরাপত্তা আধুনিকায়নের জন্য ঠিকাদারের সঙ্গে কাজ করছে, কিন্তু ভূগর্ভস্থ কাজ শেষ হয়নি। কুইন আরও লেখেন, ‘এ অবস্থায় নির্মাণকাজ অল্প সময়ের জন্য বন্ধ করলেও ঠিকাদারের দায়বদ্ধতা অপূর্ণ থেকে যাবে। এর ফলে সিক্রেট সার্ভিসের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার মিশন বাধাগ্রস্ত হবে।’ তিনি বিচারককে একান্তে ব্রিফ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসন কিছু নথি সিলগালা অবস্থায় জমা দিয়েছে।
বিচারক লিওন এসব যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণ ও খোদ প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের উদ্বেগকে আমি গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছি। তবে (চলমান নির্মাণকাজের কারণে) হোয়াইট হাউসের পাশে যে “বিশাল গর্ত” তৈরি হয়েছে, সেটি তো আসলে প্রেসিডেন্টের নিজেরই সৃষ্টি করা সমস্যা!’ গত জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জশুয়া ফিশার ন্যাশনাল ক্যাপিটাল প্ল্যানিং কমিশনকে বলেন, ‘সত্য বলতে, এই প্রকল্পের কিছু বিষয় অত্যন্ত গোপনীয় প্রকৃতির, যা নিয়ে আমরা বর্তমানে কাজ করছি।’
প্রকল্পে সামরিক বাহিনীর কোন শাখা জড়িত, খরচ কত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। গত সোমবার মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট বলেন, ‘সামরিক বাহিনী হোয়াইট হাউসে তাদের স্থাপনাগুলো কিছুটা আধুনিকায়ন করছে। এ বিষয়ে এর বেশি কোনো তথ্য দেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই।’






