ইবরাহিম (আ.) তাঁর কওমকে একত্ববাদের পথে আহ্বান জানাতে সম্ভাব্য সকল উপায় অবলম্বন করেছিলেন। তিনি তাঁদের সঙ্গে সর্বোত্তম ভাষায় বিতর্ক করেছেন, যুক্তি তুলে ধরেছেন এবং মূর্তিপূজার অর্থহীনতা প্রমাণ করেছেন।

কিন্তু দীর্ঘ চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁদের হৃদয়ে ঈমানের আলো জ্বলে ওঠেনি।

এমনকি যখন পুরো কওম কাঠ জড়ো করে বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করে তাঁকে তাতে ফেলে দিল। তাঁরা নিজ চোখে দেখল, দাউদাউ করে জ্বলা আগুন তাঁকে কোনো ক্ষতি করতে পারল না।

তবু এই স্পষ্ট অলৌকিক ঘটনাও তাঁদের অন্ধতার পর্দা সরাতে পারেনি।

মহাপ্রস্থানের কঠিন সিদ্ধান্ত

যখন দাওয়াতের সব পথ বন্ধ হয়ে গেল এবং কওমের হিদায়াতের প্রত্যাশা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ল, তখন তিনি জন্মভূমি ত্যাগের কঠিন সিদ্ধান্ত নেন।

পবিত্র কোরআনে তাঁর সেই ঘোষণা এভাবে বর্ণিত হয়েছে, “তিনি বললেন, আমি আমার রবের উদ্দেশ্যে হিজরত করছি।” (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ২৬)

ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি এই হিজরতের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে লিখেছেন, যখন একজন পথপ্রদর্শক তাঁর কওমকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন এবং তারা তাতে কোনো ভ্রূক্ষেপ করে না, তখন সেখানে অবস্থান করা বরং ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কারণ, যদি তিনি দাওয়াত অব্যাহত রাখেন তবে তা হবে একটি নিষ্ফলা কাজ; আর যদি তিনি চুপ থাকেন তবে মনে করা হতে পারে তিনি তাঁদের কর্মের প্রতি সন্তুষ্ট। তাই যখন অবস্থানের আর কোনো সংগত কারণ থাকে না, তখন হিজরত করা ওয়াজিব বা আবশ্যক হয়ে পড়ে। (ফখরুদ্দিন রাজি, মাফাতিহুল গায়েব, ২৫/৫০-৫২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮১)

মজলুমের প্রতি মহান রবের আহ্বান

ইবরাহিম (আ.)-এর এই হিজরত কেবল দেশান্তরই ছিল না, এটি ছিল বিশ্বাসের স্বাধীনতার চিরন্তন ঘোষণা। যখন কোনো জনপদে ধর্ম পালন অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং ফিতনা ও উৎপীড়নের শিকার হতে হয়, তখন সেখানে পড়ে থাকা মুমিনের জন্য অপমানের বিষয়।

আল্লাহ-তাআলা মুমিনদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, “আমার মুমিন বান্দাগণ, নিশ্চয়ই আমার জমিন প্রশস্ত। অতএব তোমরা আমারই ইবাদত করো।” (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৫৬)

এই আয়াতটি মূলত মক্কার সেই দুর্বল মুসলমানদের উদ্দেশ্যে নাজিল হয়েছিল, যাঁরা কুরাইশদের অত্যাচারে নিজেদের ঈমান প্রকাশ করতে পারছিলেন না। ইমাম বাগভি লিখেছেন, আল্লাহ তাঁদের মক্কা ছেড়ে মদিনার দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন, কারণ মদিনা ছিল তখন প্রশস্ত ও নিরাপদ আশ্রয়। (ইমাম বাগভি, মাআলিমুত তানজিল, ৬/২৫৩, দারুত তাইয়্যেবা, রিয়াদ, ১৯৮৯)

বিখ্যাত তাবেয়ি সাঈদ ইবনে জুবায়ের এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “যখন কোনো জনপদে প্রকাশ্যে পাপাচারে লিপ্ত হওয়া হয়, তখন সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ো; কারণ আল্লাহর জমিন প্রশস্ত।”

আতা (রহ.) বলেছেন, “যদি তোমাদের পাপাচারের আদেশ দেওয়া হয়, তবে পালিয়ে যাও।”

আলেমদের মতে, যে ব্যক্তি এমন কোনো দেশে বসবাস করেন যেখানে অন্যায়-অবিচার দমন করা তার পক্ষে সম্ভব নয় এবং তিনি নিজের ধর্ম পালন নিয়ে শঙ্কিত, তবে তাঁর জন্য এমন স্থানে চলে যাওয়া উচিত যেখানে আল্লাহর ইবাদত করা সহজ হয়।

স্বদেশ ত্যাগ সবসময়ই মানুষের জন্য বেদনাদায়ক। পরিচিত মাটি ও শেকড় উপড়ে ফেলার এই যন্ত্রণা আল্লাহ-তাআলা দুটি মমতাময় স্পর্শে মুছে দিয়েছেন।

প্রথমত, তিনি ‘আমার বান্দাগণ’ বলে ভালোবাসাময় সম্বোধন করেছেন।

দ্বিতীয়ত, তিনি ‘জমিন প্রশস্ত’ বলে পৃথিবীজুড়ে রিযিক ও আশ্রয়ের নিশ্চয়তা দিয়েছেন।

মুমিনের কাছে সেই ভূখণ্ডই সবচেয়ে প্রিয়, যেখানে সে মাথা নত করে কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করতে পারে।