আজকের দিনে হাতের মুঠোয় স্মার্টফোন ছাড়া জীবন চালানো অকল্পনীয়। কিন্তু ঠিক ৫৩ বছর আগে, ১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল নিউইয়র্ক সিটির সিক্সথ অ্যাভিনিউতে পথচারীরা এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। মার্টিন কুপার নামের একজন ব্যক্তি বিশাল ঘিয়ে রঙের যন্ত্রে নম্বর টিপে কানে ধরে কথা বলছিলেন। এতে তাঁদের কৌতূহল বেড়ে যায় এবং অজান্তেই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে ওঠেন। সেই দিনই মটোরোলার প্রকৌশলী মার্টিন কুপার নিজের উদ্ভাবিত বহনযোগ্য সেলুলার ফোন থেকে বিশ্বে প্রথমবারের মতো ফোনকল করেছিলেন।

পঞ্চাশ দশক আগের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত শুধু একটি কল ছিল না, তারবিহীন যোগাযোগের নতুন যুগের সূচনা। মার্টিন কুপার ১০ ইঞ্চি লম্বা এবং আড়াই পাউন্ড ওজনের ফোনটি দিয়ে কল করেছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান বেল ল্যাবরেটরিজের প্রধান জোয়েল এঞ্জেলকে। স্মৃতিচারণ করে কুপার বলেন, ‘আমি তাকে বলেছিলাম, আমি তোমাকে একটি সত্যিকারের হাতে ধরা পোর্টেবল সেলফোন থেকে কল করছি। ওপাশে তখন কেবল নীরবতা ছিল। আমার মনে হয় তিনি তখন রাগে দাঁত কিড়মিড় করছিলেন।’

বেল ল্যাবরেটরিজ গাড়িতে ব্যবহারযোগ্য ফোনের ওপর জোর দিয়েছিল। কিন্তু কুপার চেয়েছিলেন ফোন হবে মানুষের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সবসময় সঙ্গী। তাঁর প্রোটোটাইপ ফোনের বাণিজ্যিক সংস্করণ মটোরোলা ডায়নাট্যাক ৮০০০এক্স বাজারে আসে ১১ বছর পর, ১৯৮৪ সালে। তখন এর দাম ছিল প্রায় ১১ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকা।

কুপারের ফোনটির সঙ্গে আইফোনের তুলনায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য। সেটির ওজন ৭৯০ গ্রাম, আইফোন ১৪-এর চেয়ে প্রায় চারগুণ ভারী। চার্জ হতে লাগত ১০ ঘণ্টা, কথা বলা যেত মাত্র ৩০ মিনিট এবং স্ট্যান্ডবাই ১২ ঘণ্টা। ওপরে ৬ ইঞ্চি অ্যান্টেনা থাকলেও ক্যামেরা বা বার্তা আদান-প্রদানের সুবিধা ছিল না।

৫০ বছর আগের সেই কলের মূল প্রক্রিয়া আজও একই রকম। কণ্ঠস্বর বৈদ্যুতিক তরঙ্গে রূপান্তরিত হয়ে রেডিও তরঙ্গে মডুলেট হয়, নিকটস্থ টাওয়ারে যায়, সেখান থেকে গন্তব্যে পৌঁছে উল্টো প্রক্রিয়ায় কথা শোনা যায়। পার্থক্য শুধু টাওয়ারের সংখ্যা—তখন হাতে গোনা কয়েকটি, আজ পৃথিবীজুড়ে ছড়ানো।

৯৮ বছর বয়সী মার্টিন কুপার মনে করেন, ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর প্রয়োজনমতো অ্যাপ তৈরি বা নির্বাচন করে দেবে। ফোন শরীরের সার্বক্ষণিক চিকিৎসক হয়ে উৎসাহ বাড়াবে এবং জীবনমান উন্নত করবে। আমরা এখনও মুঠোফোন বিপ্লবের শুরুর পর্যায়ে, বলে বিশ্বাস করেন তিনি।

নিউইয়র্কের রাস্তায় আড়াই পাউন্ডের ইটের মতো ফোন থেকে করা সেই কল যোগাযোগের পাশাপাশি মানবসভ্যতাকে মুঠোয় এনেছে। কুপারের সাহস ও দূরদর্শিতা না থাকলে আজও হয়তো কর্ডলেস ফোনের জন্য লড়াই করতাম।

সূত্র: বিবিসি ও এনপিআর