‘প্রতিটি ভালো কাজই সদকা’
সাধারণত আমরা সদকা বলতে শুধু অর্থ বা সম্পদ বিতরণকেই বুঝি। কিন্তু মহানবী (সা.) এই ধারণাকে সম্পূর্ণ উলটে দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, “প্রতিটি ভালো কাজই সদকা।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০২১)
এই অমর নির্দেশনা সমাজের প্রত্যেকের জন্য পুণ্যের দ্বার খুলে দিয়েছে।
সদকার বিস্তৃতি
হাদিস বিশারদ ইবনে বাত্তাল (র.)-এর মতে, এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, মানুষ যা কিছু ভালো কাজ করে বা বলে, তা তার আমলনামায় সদকা হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।
হাদিসে এই ভালো কাজকে ‘মারুফ’ বলা হয়েছে।
ইমাম রাগেব আল-ইসফাহানির মতে, শরিয়ত ও বিবেক যে কাজকে সুন্দর বলে স্বীকার করে, তা-ই ‘মারুফ’।
অন্যদিকে ইবনে আবি জামরা (র.) মনে করেন, শরিয়তের দৃষ্টিতে যা কিছু পুণ্যময় কাজ হিসেবে স্বীকৃত, তার ওপরই ‘মারুফ’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ১০/৪৩৮, দারুল মা’রিফাহ, বৈরুত, ১৩৭৯ হিজরি)।
এখানে ‘সদকা’ বলতে মূলত সওয়াব বা পরকালীন প্রতিদানকে বোঝানো হয়েছে। সঠিক নিয়ত থাকলে এই প্রতিদান নিশ্চিত।
কারো সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, পথ হারানো ব্যক্তিকে পথ দেখানো, দৃষ্টিহীনকে সাহায্য করা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা এবং নিজের বালতি থেকে অন্যের পাত্রে পানি ঢেলে দেওয়া—এসবই সদকার অন্তর্ভুক্ত।
সদকা কি শুধু ধনীদের জন্য
ইসলামে সদকা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য সীমাবদ্ধ নয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেক মুসলমানের ওপর সদকা করা আবশ্যক।”
সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন, “আল্লাহর রাসুল, যদি কারো সেই সামর্থ্য না থাকে?”
তিনি বললেন, “সে নিজ হাতে কাজ করে নিজেকে লাভবান করবে এবং সদকা করবে।”
তারা পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, “যদি সে এটাও না পারে?”
তিনি বললেন, “সে কোনো বিপন্ন ব্যক্তিকে সাহায্য করবে।” তারা আবার বললেন, “যদি সে এটাও করতে অপারগ হয়?”
নবীজি বললেন, “তবে সে ভালো কাজের আদেশ দেবে।”
সর্বশেষ সাহাবিরা জানতে চাইলেন, “যদি সে এটাও না করে?”
তিনি উত্তর দিলেন, “তবে সে মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকবে, আর এটাই তার জন্য সদকা।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৪৪৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০০৮)
সৎপথে থেকে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক সময় কাটানো বা জৈবিক চাহিদা পূরণ করাও সদকা। সাহাবিরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, নিজের কামনা পূরণ করলেও কি সওয়াব পাওয়া যাবে?
দৈনন্দিন জীবনের অনেক ছোট কাজই সদকা হিসেবে গণ্য হয়। হাদিস থেকে প্রাপ্ত কিছু সদকার উদাহরণ নিম্নরূপ:
১. পারিবারিক জীবন: সৎপথে থেকে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক সময় কাটানো বা জৈবিক চাহিদা পূরণ করাও সদকা। সাহাবিরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, নিজের কামনা পূরণ করলেও কি সওয়াব পাওয়া যাবে?
নবীজি উত্তরে বললেন, “মানুষ যদি হারামে লিপ্ত হতো তবে কি তার পাপ হতো না? ঠিক তেমনি হালাল পথে তা পূরণ করায় তার জন্য রয়েছে সওয়াব।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০০৬)।
২. সামাজিক আচরণ: কারো সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, পথ হারানো ব্যক্তিকে পথ দেখানো, দৃষ্টিহীনকে সাহায্য করা, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু (পাথর, কাঁটা বা হাড়) সরিয়ে ফেলা এবং নিজের বালতি থেকে অন্যের পাত্রে পানি ঢেলে দেওয়া—এসবই সদকার অন্তর্ভুক্ত। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৬)
৩. বিচার ও দয়া: দুজন বিবাদমান ব্যক্তির মধ্যে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে মীমাংসা করে দেওয়া একটি সদকা। আবার কোনো ব্যক্তিকে তার সওয়ারিতে উঠতে সাহায্য করা কিংবা তার মালপত্র সওয়ারিতে তুলে দেওয়াও সদকার সওয়াব বয়ে আনে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৮৯১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০০৯)
দেহের প্রতিটি গ্রন্থির সদকা
মহানবী (সা.) বলেছেন, “প্রতিটি মানুষকে ৩৬০টি জোড় বা গ্রন্থি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই প্রতিটি গ্রন্থির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সদকা করা জরুরি। কেউ যদি আল্লাহু আকবার, আলহামদুলিল্লাহ বা সুবহানাল্লাহ বলে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, রাস্তা থেকে পাথর বা কাঁটা সরায় অথবা ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ করে—তবে এই ৩৬০টি গ্রন্থির সমপরিমাণ ভালো কাজের মাধ্যমে সে নিজেকে দোজখের আগুন থেকে মুক্ত করে নেয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০০৭)
ইসলামি জীবনদর্শনে সদকা কোনো কঠিন বা ব্যয়বহুল কাজ নয়। এটি দৈনন্দিন আচরণের অংশ। পথে অপরিচিতকে সাহায্য করা থেকে মিষ্টি কথা বলা—সবই এই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।






