দেড় দশক বিরতির পর ভারতে জনগণনা বা জনশুমারির কাজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে। প্রায় ৩০ লাখ কর্মী এক বছর ধরে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এই কাজ সম্পন্ন করবেন। প্রতি ১০ বছর অন্তর ভারতে জনগণনা হয়, শেষবারেরটা ছিল ২০১১ সালে। কোভিড–১৯ মহামারির জন্য ২০২১ সালে নির্ধারিত গণনা স্থগিত হয়েছিল।

এবার জনগণনা তিন ধাপে সম্পন্ন হবে। প্রথম ধাপে নির্দিষ্ট কয়েকদিন নাগরিকরা ডিজিটালভাবে নিজেদের তথ্য দাখিল করতে পারবেন। এজন্য অনলাইন ফর্ম পূরণের সুবিধা রয়েছে। একটি ‘সেল্ফ এনুমারেশন পোর্টাল’ চালু হচ্ছে, যেখানে বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে সব তথ্য দিতে হবে। অ্যাপটি ইংরেজি, হিন্দি ও ১৪টি আঞ্চলিক ভাষায় উপলব্ধ। মোট ৩৩টি প্রশ্ন থাকবে।

ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল মৃত্যুঞ্জয় কুমার নারায়ণ গত সোমবার এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, অনলাইনে ফর্ম পূরণের পর একটি আইডি দেওয়া হবে। গণনাকারীরা বাড়িতে গিয়ে সেই তথ্য যাচাই করবেন এবং গৃহীত হলে অনলাইনে আপলোড করবেন। তিনি বলেন, শুরু থেকেই এবারের জনগণনা ডিজিটাল চরিত্রের হবে।

সেল্ফ এনুমারেশনের পর দ্বিতীয় ধাপে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গৃহ গণনা চলবে। বাড়িটি কী ধরনের—পাকা না কাঁচা, বাড়িতে কী কী সুবিধা আছে—তা নথিবদ্ধ হবে। পরবর্তী ধাপে জনগণনা করা হবে। প্রত্যেক গৃহের বাসিন্দাদের তথ্যসহ জীবিকা, বেতন, কর্মসংস্থানের ধরন ইত্যাদি রেকর্ড করা হবে। তৃতীয় ধাপ ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে।

যেসব রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে, সেখানে গণনা ভোটের পর শুরু হবে। গৃহ ও জনগণনার মূল কাজের ১৫ দিন আগে সেল্ফ এনুমারেশন চালু হবে। চূড়ান্ত ফলাফল ২০২৭ সালেই প্রকাশিত হবে।

এবার প্রথম জনগণনার সঙ্গে জাত গণনাও হবে। আগে শুধু তফসিলি জাতি ও উপজাতি গণনা করা হতো, এবার অন্যান্য অনগ্রসর জাতি (ওবিসি) চিহ্নিত করা হবে।

জনগণনা শুরুর সঙ্গে নতুন বিতর্ক ও সংশয় দেখা দিয়েছে। আইনসভায় ‘মহিলা সংরক্ষণ আইন’ কার্যকর করা ও লোকসভা–বিধানসভার আসন বাড়ানো নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মীমাংসা কীভাবে হবে, তা এখনো অজানা।

এই জনগণনার ভিত্তিতেই লোকসভা ও বিধানসভার আসন সংখ্যা বাড়বে। তার জন্য ‘ডিলিমিটেশন কমিশন’ গঠন করতে হবে। আইনসভায় নারীদের ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি কেন্দ্রীয় সরকার দিয়েছে। গত বছর সেই বিল পাস হয়। তখন ঠিক হয়, নারী আসন সংরক্ষণ চূড়ান্ত হবে এই জনগণনার পর।

জনগণনা ২০২৭ সালে শেষ হলে ডিলিমিটেশনের কাজে অন্তত দুই বছর লাগবে। ফলে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে নারী সংরক্ষণ ও ডিলিমিটেশন সম্পন্ন হবে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার চায় এগুলো তার আগেই শেষ করতে।

এর জন্য সংবিধান সংশোধন দরকার। সরকার নারী আসন সংরক্ষণ ও লোকসভার আসন বাড়ানোর জন্য দুটি পৃথক বিল আনতে চায়, যাতে ২০২৯ সালের ভোটেই চালু হয়। তারা এই দুই বিষয়কে জনগণনার আওতা থেকে বাদ দিতে চায়।

তবে আইনসভার উভয় কক্ষে সংবিধান সংশোধন বিল দুটি দুই–তৃতীয়াংশ ভোটে পাস করতে হবে। বর্তমানে সরকারের এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, বিরোধীদের সমর্থন লাগবে।

কংগ্রেস সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিরোধীদের মতে, জনগণনা শুরু হয়ে গেছে, তখন ২০১১ সালের তথ্য ভিত্তিতে নারী সংরক্ষণ চূড়ান্ত করা অর্থহীন। নির্বাচনী আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণেও তাদের একই অবস্থান। ফলে সরকার ও বিরোধীদের এই টানাপোড়েন কোন দিকে যাবে, সেদিকেই এখন সবার নজর।