প্রতি বছর লাখো মুসলিম হজের জন্য পবিত্র কাবা শরিফে যান। আমরা দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কাবার দিকে মুখ করে আদায় করি। কাবাকে বলা হয় বাইতুল্লাহ, অর্থাৎ আল্লাহর ঘর।

পৃথিবীর তিনটি মসজিদকে ‘হারাম’ বা সম্মানিত বলা হয়, যার মধ্যে প্রথম হলো কাবা। প্রতিটি মুসলিমের হৃদয়ে কাবা কেন্দ্রস্থল।

আজ আমরা কাবা সম্পর্কে কয়েকটি অজানা তথ্য তুলে ধরছি।

অনেকে মনে করেন, বর্তমান কাবা শরিফ নবী ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর আমলের আদি কাঠামোর মতোই। কিন্তু তা নয়। বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও যুদ্ধের কারণে কাবা বারবার পুনর্নির্মিত হয়েছে।

নবীজি (সা.) চেয়েছিলেন কাবাকে নবী ইব্রাহিমের আদি ভিত্তির ওপর পুনর্নির্মাণ করতে, কিন্তু নতুন মুসলিমদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে ভেবে তিনি তা করেননি।

নবুয়ত প্রাপ্তির আগে কোরাইশরা কাবা পুনর্গঠন করার সময় অর্থের অভাবে হজরত ইব্রাহিমের মূল ভিত্তির একটি অংশ দেয়ালের বাইরে রেখে দেয়। এই অংশটিই এখন ‘হিজরে ইসমাইল’ বা ‘হাতিম’ নামে পরিচিত।

নবীজি (সা.) নিজেও চেয়েছিলেন কাবাকে নবী ইব্রাহিমের আদি ভিত্তির ওপর পুনর্নির্মাণ করতে, কিন্তু নতুন মুসলিমদের মনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে ভেবে তিনি তা করেননি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫৮৩)

পরবর্তীকালে আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) এটি বড় করে নির্মাণ করলেও উমাইয়াদ যুগে আবার কোরাইশদের নকশায় ফিরিয়ে আনা হয়। ইমাম মালিক (রহ.)-এর পরামর্শে খলিফা হারুনুর রশিদ এটি আর পরিবর্তন করেননি, যাতে কাবা শাসকদের খেলনা না হয়ে পড়ে।

৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে ‘কারমাতি’ নামক চরমপন্থী গোষ্ঠী হজের সময় মক্কায় আক্রমণ করে হাজারো হাজিকে হত্যা করে এবং হাজরে আসওয়াদ ছিনিয়ে বাহরাইনে নিয়ে যায়। (ইবনে কাসির, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১১/১৬০, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৩)

দীর্ঘ ২২ বছর হাজরে আসওয়াদ মক্কায় ফিরে আসেনি। ৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে এটি পুনরায় মক্কায় ফিরিয়ে আনা হয়। বর্তমানে পাথরটি একটি পূর্ণ খণ্ড নয়, বরং কয়েকটি ছোট খণ্ডের সমষ্টি যা রূপালি ফ্রেমে আবদ্ধ।

মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা.) কাবার চাবি ওসমান ইবনে তালহার বংশধরদের হাতে তুলে দেন। তিনি ঘোষণা করেন, জালেম ছাড়া কেউ তাদের কাছ থেকে এই চাবি কেড়ে নেবে না। আজও সেই বংশের উত্তরসূরিরাই কাবার চাবি সংরক্ষণ করেন।

তিনি ঘোষণা করেন, জালেম ছাড়া কেউ তাদের কাছ থেকে এই চাবি কেড়ে নেবে না। আজও সেই বংশের উত্তরসূরিরাই কাবার চাবি সংরক্ষণ করেন।

তিনি বলেছিলেন, “হে বনু তালহা, এটি গ্রহণ করো চিরস্থায়ীভাবে...।” (ইবনে হাজার, আল-ইসাবাহ ফি তাময়িযিস সাহাবাহ, ৪/৪৪৭, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৪১৫ হি.)

মসজিদে হারামে ইবাদতের সওয়াব অন্য যেকোনো মসজিদের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। নবীজি (সা.) বলেছেন, “মসজিদে হারামে এক ওয়াক্ত নামাজ পড়া অন্য সব মসজিদের চেয়ে এক লক্ষ গুণ বেশি সওয়াব।” (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৪০৬)

গাণিতিকভাবে, এখানে এক ওয়াক্ত নামাজ অন্য জায়গায় প্রায় ৫৫ বছর নামাজের সমান। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মহানবীর উম্মতের জন্য বিশাল রহমত। মানুষের জীবন সীমিত হলেও এই আমল সেই জীবনকে হাজার বছরের ইবাদতে পূর্ণ করে।

কাবার গিলাফকে বলা হয় ‘কিসওয়া’। এটি সবসময় কালো ছিল না। বিভিন্ন সময় সাদা, সবুজ এমনকি লাল রঙের গিলাফও পরানো হয়েছে। আব্বাসীয় খলিফাদের যুগ থেকে কালো গিলাফের প্রথা চলে আসছে।

বর্তমানে প্রতি বছর হজের সময় দামি রেশমি কাপড় ও স্বর্ণের সুতো দিয়ে তৈরি নতুন গিলাফ পরানো হয়। (আজ-জরাকাশি, আখবারু মাক্কাহ, ১/২৫২, মাকতাবাতুস সাকাফাহ, মক্কা, ১৯৯৬)

কাবা শরিফের ঠিক ওপরে সপ্তম আসমানে ফেরেশতাদের একটি পবিত্র ইবাদতগাহ আছে, যার নাম বাইতুল মামুর। একে বলা হয় ফেরেশতাদের কাবা

কাবা শরিফের ঠিক উপরে সপ্তম আসমানে ফেরেশতাদের পবিত্র ইবাদতগৃহ বাইতুল মামুর রয়েছে। এটিকে ফেরেশতাদের কাবা বলা হয়। এখানে প্রতিদিন ৭০,০০০ ফেরেশতা ইবাদত করে প্রবেশ করেন এবং একবার বের হলে আর ফিরে আসেন না।

মিরাজের রাতে নবীজি (সা.) এখানে নবী ইব্রাহিম (আ.)-কে দেখেছিলেন। সুরা তুরের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এই ঘরের কসম খেয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২০৭)