মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা চলছে। তবে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত ওয়াশিংটন সেখানে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে।
কাতারভিত্তিক আল–জাজিরার সাক্ষাৎকারে রুবিও এসব কথা বলেন। গতকাল সোমবার তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, ‘যেকোনো মূল্যে হোক’ হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা হবে এবং ‘কয়েক মাসের মধ্যে নয়, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে’ যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধে তাদের লক্ষ্য অর্জন করবে।
রুবিও বলেন, সুযোগ পেলে ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে যুক্তরাষ্ট্র স্বাগত জানাবে, তবে এটি তাদের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য নয়। যুদ্ধকালে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় ন্যাটো মিত্রদের তিনি সমালোচনা করেন। ওয়াশিংটন কিউবা ও ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানান তিনি।
‘ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগ করতে হবে’
রুবিও বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে হবে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য হুমকিস্বরূপ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। ইসরায়েলপন্থী রুবিও জোর দিয়ে বলেন, ‘ইরান সরকার কখনো পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না।’
তিনি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সরাসরি হুমকি। ‘তারা যে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করছে, তার একমাত্র লক্ষ্য হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনকে আক্রমণ করা।’ আরব দেশগুলোর কথা উল্লেখ করলেও ইসরায়েলের নাম কৌশলে এড়িয়ে যান রুবিও।
ইরান বেসামরিক কাজে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করতে পারে, তবে এমনভাবে নয় যা দ্রুত অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেবে। এসব বক্তব্যের পর তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান প্রশ্ন তুলেছেন, কবে ইরান এ অঞ্চলের জন্য আক্রমণের হুমকি হয়ে উঠেছিল? ‘গত তিন শতাব্দীর মধ্যে ইরান কবে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আক্রমণ করেছে? এখন কেন তারা এমন করছে? কারণ, একটি অসম যুদ্ধে তারা দুর্বল প্রতিপক্ষ। তাই নিজেকে রক্ষা করতে তারা এ যুদ্ধের বিস্তার ঘটাচ্ছে।’
‘যেকোনো মূল্যে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা হবে’
হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্বের দাবি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেবে না। রুবিও সতর্ক করে বলেন, ‘কেবল আমরা নয়, বিশ্বের কেউ–ই হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের সার্বভৌমত্বের দাবি মেনে নেবে না। এটি একটি অদ্ভুত নজির স্থাপন করবে...বিভিন্ন দেশ এখন আন্তর্জাতিক জলপথ দখল করে তা নিজেদের বলে দাবি করবে। হরমুজ প্রণালি খোলা থাকবে…এটি যেকোনো মূল্যে খোলা থাকবে।’
‘ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলছে’
তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অধিকাংশ আলোচনা পরোক্ষভাবে চলছে। রুবিও বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের ভেতরের কিছু পক্ষ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এবং কিছু সরাসরি আলোচনা চলছে।’ ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট সব সময় কূটনীতি পছন্দ করেন, সব সময় একটি সমাধান চান।’
একইসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি দিচ্ছেন। ট্রাম্প বলেছেন, শিগগিরই যুদ্ধবিরতি না হলে তিনি ‘ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস’ করবেন।
‘কয়েক মাসে নয়, কয়েক সপ্তাহে যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণ হবে’
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান দ্রুত এগোচ্ছে। রুবিও বলেন, ‘লক্ষ্যগুলো হলো তাদের বিমানবাহিনী ধ্বংস করা, যা ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে। তাদের নৌবাহিনী ধ্বংস করা, যা অনেকটাই অর্জিত হয়েছে।’ ‘তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যন্ত্রের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো গেছে…এবং আমরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদনকারী কারখানাগুলোও ধ্বংস করতে যাচ্ছি। আমরা ঠিক সময়ে বা সময়ের আগেই এগোচ্ছি। আমরা কয়েক মাসের মধ্যে নয়, বরং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এগুলো অর্জন করব। এটি কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার। আমি ঠিক কত সপ্তাহ হবে বলব না, তবে এটি কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার, মাসের নয়।’
‘ইরানের সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান পরিষ্কার নয়’
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অবস্থান এখনো অস্পষ্ট। রুবিও বলেন, ‘আমরা এখনো জানি না, তিনি ক্ষমতায় আছেন কি না। এটুকু জানি, তারা দাবি করে, তিনি ক্ষমতায় আছেন। কেউ তাঁকে দেখেনি। কেউ তাঁর কোনো বক্তব্য শোনেনি। এখন পরিস্থিতি খুবই অস্পষ্ট। ইরানের ভেতরে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়।’
‘ইরানে নেতৃত্বের পরিবর্তন সামরিক অভিযানের লক্ষ্য নয়’
ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে যুক্তরাষ্ট্র স্বাগত জানাবে, তবে এটি সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য নয়। রুবিও বলেন, ‘আমরা সব সময় এমন একটি পরিস্থিতিকে স্বাগত জানাব, যেখানে ইরানের লোকজন এমন নেতৃত্বে থাকবে, যাঁরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রাখে। ইরানি জনগণ আরও ভালো নেতৃত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে।’ যদি রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব হয়, যুক্তরাষ্ট্র ভূমিকা রাখতে ইচ্ছুক। ‘একে সহজতর করতে যদি আমাদের কিছু করার সুযোগ থাকে, আমরা তা করতে ইচ্ছুক হব, অবশ্যই হব।’
কাতারে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল মাসগ্রাভ বলেন, ‘মূলত সরকার উৎখাত করাই তাদের লক্ষ্য ছিল; নিজেদের সে অবস্থান থেকে তারা ধীরে ধীরে সরে গেছে।’ ‘এখন আমরা দেখতে পাই, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে বলছেন, তিনি এমন কিছু অংশের সঙ্গে আলোচনা করছেন, যাঁরা একটি নতুন সরকারের অংশ হতে পারে। আদতে সেখানে অনেক বিভ্রান্তি আছে, কিন্তু এটি এখন আর প্রধান লক্ষ্য নয়। এটি এমন কিছু নয়, যা তারা স্পষ্টভাবে ঘোষণা বা প্রকাশ করছে।’
ন্যাটো মিত্রদের সমালোচনা ও জোট পুনর্মূল্যায়নের হুঁশিয়ারি
কয়েকটি ন্যাটো দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিচ্ছে না। রুবিও বলেন, ‘আমাদের স্পেনের মতো দেশ আছে, যারা ন্যাটোর সদস্য এবং যাদের আমরা রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, তারা আমাদের তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দিচ্ছে না এবং এ নিয়ে গর্ব করছে, আমাদের তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিচ্ছে না।’ ‘আপনি না হয় নিজেকেই জিজ্ঞাসা করুন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এসবে আর কী অবশিষ্ট আছে? যদি আমাদের জন্য ন্যাটো কেবল ইউরোপকে আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য হয়, কিন্তু আমরা যখন ঘাঁটি ব্যবহার করতে চাইব, তখন তারা তা দিতে অস্বীকার করবে, তাহলে এটি খুব ভালো ব্যবস্থা নয়।’ এসব পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।






