রমজানের রোজা, ইবাদত এবং পরিমিত জীবনযাপন আমাদের মনে গভীর প্রশান্তি ও স্থিরতা নিয়ে আসে। এই মাসজুড়ে স্বভাবের রুক্ষতা অনেকাংশে কমে যায়।

কিন্তু ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই চেনা অস্থিরতা ও খিটখিটে মেজাজ ফিরে আসে। তুচ্ছ ব্যাপারে রেগে ওঠা বা অন্যের ওপর চড়াও হওয়ার পুরনো অভ্যাস রমজানের অর্জনকে ফিকে করে দেয়।

তাহলে রমজানের অর্জিত ধৈর্য ও সহনশীলতা কি আমরা পুরো বছর ধরে রাখতে পারি না? বিশেষ করে যারা সহজেই রাগান্বিত হয়ে যান, তারা কীভাবে ঈদের পরও মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করবেন?

ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, রাগ যাবতীয় মন্দের চাবিকাঠি এবং শয়তানের হৃদয়ে প্রবেশের একটি প্রধান পথ। তবে সব রাগই নিন্দনীয় নয়। নিজের স্বার্থ বা অহংকার থেকে উদ্ভূত রাগ বর্জনীয় হলেও আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনের ফলে যে সংকোচন জন্মায়, তাকে ‘লিল্লাহি ফিল্লাহ’ বা আল্লাহর জন্য রাগ বলা হয়, যা প্রশংসনীয়।

যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী ও মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।
সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সেই মানুষদের প্রশংসা করেছেন যারা নিজেদের রাগ জয় করতে পারে। বলা হয়েছে, “যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী ও মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)

এখানে ‘কাজমে গাইজ’ বা ক্রোধ সংবরণ শব্দটি মনের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয়।

হাদিসে রাগ নিয়ন্ত্রণকারীদের জন্য বিশাল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) এ ব্যাপারে কয়েকটি কার্যকর নির্দেশনা দিয়েছেন:

১. আত্মনিয়ন্ত্রণই প্রকৃত বীরত্ব: আমরা সাধারণত কুস্তিতে অন্যকে হারানোকেই বীরত্ব মনে করি। কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “সেই ব্যক্তি প্রকৃত বীর নয় যে অন্যকে কুস্তিতে পরাস্ত করে, বরং প্রকৃত বীর সেই ব্যক্তি যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)

২. জান্নাতের নিশ্চয়তা: এক ব্যক্তি নবীজির কাছে সংক্ষিপ্ত উপদেশ চাইলে তিনি বারবার বললেন, “রাগ করো না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৬) এমনকি ইবনে ওমর (রা.) জানতে চাইলে নবীজি (সা.) উত্তর দিলেন, “রাগ কোরো না।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৬৬৩৫)

৩. পরকালে বিশেষ পুরস্কার: নবীজি (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি নিজের রাগ সংবরণ করবে—অথচ সে তা চরিতার্থ করার ক্ষমতা রাখে—আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে কাছে ডেকে নেবেন।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৭৭)

আমি এমন একটি কালিমা জানি যা পাঠ করলে তার রাগ দূর হয়ে যাবে। তা হলো—আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৮২

রমজানের প্রশান্তি ধরে রাখতে এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়:

১. আউযুবিল্লাহ পাঠ: নবীজির সামনে দুজন ঝগড়া করছিল, একজনের মুখ রাগে লাল হয়ে গিয়েছিল। তখন নবীজি (সা.) বললেন, “আমি এমন একটি কালিমা জানি যা পাঠ করলে তার রাগ দূর হয়ে যাবে। তা হলো—আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৮২)

২. অজুর মাধ্যমে শীতলতা: রাগ শয়তান থেকে আসে, যা আগুনের সৃষ্টি। আগুন নেভাতে পানি যেমন ব্যবহৃত হয়, রাগ নিয়ন্ত্রণে অজু অত্যন্ত কার্যকর। রাগের সময় তাৎক্ষণিক অজু করলে স্নায়বিক উত্তেজনা কমে।

৩. শারীরিক অবস্থান পরিবর্তন: রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ যখন রাগান্বিত হয়, সে যদি দণ্ডায়মান থাকে তবে যেন বসে পড়ে। এতেও রাগ না কমলে সে যেন শুয়ে পড়ে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮২) আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও শরীরের ভঙ্গি পরিবর্তনের পরামর্শ দেয়।

৪. মৌনতা অবলম্বন: রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ রাগান্বিত হলে সে যেন চুপ থাকে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২১৩৬)

৫. পরিবেশ পরিবর্তন: রাগ উস্কানো ব্যক্তি বা পরিস্থিতি থেকে সম্ভব হলে কিছুক্ষণের জন্য সরে যান। নিজেকে শান্ত হওয়ার সুযোগ দিন।

উপসংহারে, রাগ জয় করাই শয়তানকে পরাজিত করা। রমজানের পবিত্রতা ও ধৈর্য যদি বছরের বাকি দিনগুলোতে ধরে রাখতে পারি, তবেই সমাজ শান্তিময় হয়ে উঠবে।