মাদারীপুর শহরের পাকদি এলাকার সাইফুল ইসলাম (৪০) এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগে চাকরি করেন। সোমবার ভোর থেকে শহরের তিনটি তেলপাম্প ঘুরেও তিনি জ্বালানি তেল পাননি। পরে ইউসূফ ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য অপেক্ষা শুরু করেন। দুপুর ১২টার দিকে এখানে তেলের ট্রাক এলে দুই শতাধিক মোটরসাইকেলচালক হুমড়ি খেয়ে পড়েন। বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। পুলিশ উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করলে বেলা দুইটার দিকে তিনি ৩০০ টাকার পেট্রল পান।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর সাইফুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে তেল পেলাম। সকাল ৯টা থেকে এই পাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে এক বেলা শেষ। অন্য বেলায় কাজ করব কখন? ৩০০ টাকার তেল দিয়ে তো আর দুই দিনও চলবে না। তারপর তেল ছাড়া চলব কীভাবে, সেটাই ভাবছি। এমন চলতে থাকলে মার্কেটিংয়ের যে চাকরিটা করি, সেটাও চলে যাবে।’

সোমবার সরেজমিনে দেখা গেছে, শত শত মানুষ পেট্রল কেনার জন্য ভিড় করেছেন। তেল সরবরাহ করতে কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছেন। পুলিশ ও পাম্পের কর্মীরা হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে ক্রেতাদের শান্ত রাখার চেষ্টা করছেন। সাইফুলের মতো অন্তত ২৫০ জন মোটরসাইকেলচালক সকাল ৯টা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত তেলের জন্য অপেক্ষা করছেন। মোটরসাইকেলের জটলার কারণে অন্য গাড়ির ঢোকার জায়গা ছিল না। বেলা একটার দিকে একটি অ্যাম্বুলেন্স এলে চাপের কারণে ফিরে যেতে হয়।

ক্রেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে বলছেন, পাম্পগুলোতে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেল থাকলেও ২৪ ঘণ্টা সরবরাহ হয় না। নির্দিষ্ট সময়ে তেল দিয়ে পরে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ থাকে। ফলে ক্রেতারা ভোগান্তিতে পড়ছেন।

ফিলিং স্টেশনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, জ্বালানি তেল সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো চাহিদা অনুসারে তেল দিচ্ছে না। সার্বক্ষণিক সরবরাহ চালু থাকলে ভিড় কমবে, নয়তো সংকট বাড়বে। ইউসূফ ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউসূফ হাওলাদার বলেন, আগের তুলনায় সরবরাহ বাড়লেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন। ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৩০ হাজার লিটার পেট্রল বিক্রি হলেও মার্চে তা বেড়ে ৪০ হাজার লিটার হয়েছে। তবু ক্রেতার চাপ এত যে নির্ধারিত সময় ছাড়া ২৪ ঘণ্টা সরবরাহ সম্ভব না।

রাজৈর উপজেলা থেকে আসা সুমন বিশ্বাস রাজৈরে তেল না পেয়ে মাদারীপুর শহরে এসেছেন। পাঁচ ঘণ্টার বেশি অপেক্ষায় তিনি ৩০০ টাকা পেট্রল পেয়েছেন। সুমন বলেন, ‘জরুরি প্রয়োজনে মোটরসাইকেল ব্যবহার করি। সেটি চালানো এখন কষ্টসাধ্য। তেল কিনতে এমন দুর্ভোগ সহ্য করা যায় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় অপচয় থেকে মুক্তি চাই।’

আরেক ক্রেতা মোহাম্মদ হাসিবুল্লাহ বলেন, জেলার অনেক পাম্পে দিনের বেশির ভাগ সময় পেট্রল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ। এই পাম্পে দিনে একবার তেল পাওয়া যায়, তাই ভিড় বেশি। অন্য পাম্পগুলোতে তেল থাকলেও বিক্রি হচ্ছে না।

মাদারীপুরের সাবেক সংসদ সদস্য শাজাহান খান ও তাঁর পরিবারের সার্বিক ফিলিং স্টেশনে দিনের বেশির ভাগ সময় পেট্রল ও অকটেন বন্ধ। তারা শুধু নিজেদের ‘সার্বিক পরিবহন’ চালানোর জন্য ডিজেল দিচ্ছেন। ডিজেল থাকলেও অন্য যানবাহনে বিক্রি হচ্ছে না।

মাদারীপুর সদরের মস্তফাপুরের মাদারীপুর ফিলিং স্টেশন, পখিরার আড়িয়াল খাঁ ফিলিং স্টেশন, ঘটকচরের মোল্লা ফিলিং স্টেশন ও খোয়াজপুরের খান ফিলিং স্টেশন সংকটে দিনের বেশির ভাগ সময় বন্ধ। দু–এক দিন পরপর সীমিত সময় তেল দিয়ে আবার বন্ধ হয়।

জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সারা দেশেই জ্বালানি তেলের সংকট থাকায় মাদারীপুরের তেলপাম্পগুলোয় তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। তবে তেল মজুত রাখার কোনো সুযোগ নেই। যদি কোনো ফিলিং স্টেশন তেল মজুত রাখে, তাহলে সেই স্টেশনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমরা নিয়মিত তদারকি ও অভিযান অব্যাহত রেখেছি।’