রেললাইন পেরিয়ে বাঁ দিকে টিলার ওপর বন বাংলো ফেলে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। বন তখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন। উঁচু টিলার ঘন ঝোপ থেকে বনমোরগের ঘুম-তাড়ানো ডাক বনের নিস্তব্ধতায় ছেদ পড়ায়। দুপাশের লম্বা গাছগুলো আকাশ ছুঁয়েছে, নিচে কুয়াশায় মোড়া বুনো গাছ-লতা আর ঘন বাঁশঝাড়। মাকড়সার জালে আটকে কীটপতঙ্গ ছটফট করছে। আমরা কয়েকজন তরুণ গবেষক কুয়াশাভেজা পথে সতর্কভাবে এগোচ্ছি। হঠাৎ পাশের খাড়া টিলা থেকে উচ্চস্বরে ‘হোও-ওক, হোও-ওক’ বা ‘হোলোক-হোউ, হোউ-হোলোক’ ডাক বনকে নাড়িয়ে দেয়। জীবনে প্রথম এমন শব্দ শুনে কিছুটা ভয় পাই। কিছুক্ষণ পর আরেকজন যোগ দেয়। দুজনের চড়া ডুয়েট ডাকে বন যেন জেগে ওঠে।

আজ থেকে প্রায় দুই যুগ আগে শীতের এক ভোরে শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া পাহাড়ি বনে এমন ডাক শুনে যে প্রাণীটি দেখে দেহ-মনে শিহরণ বয়ে গিয়েছিল, সেটি ছিল উল্লুক। ইংরেজি নাম ওয়েস্টার্ন হোলোক গিবন। লাতিন ভাষায় হোলোক হোলোক। বিজ্ঞানীদের কাছে এরা ‘স্মল এইপ’ নামেও পরিচিত।

উল্লুক শব্দটি ছোটবেলায় গ্রামের এক মুরব্বির মুখে প্রথম শুনি। কোনো তুচ্ছ কারণে খেলার সাথিকে তিনি ‘উল্লুক’ বলে গাল দেন। প্রথমে বুঝতে না পারলেও পরে ধরে নিই, উল্লুক মানে মূর্খ টাইপের কিছু। আহাম্মক বা উজবুকের মতো কাজ করলে এখনো সমাজে উল্লুক বলে তিরস্কার করা হয়। গ্রামের বুলিতে গালি হিসেবেও ব্যবহার হয়। কিন্তু বড় হয়ে সত্যিকারের বুনো উল্লুক দেখে ছোটবেলার স্মৃতির সঙ্গে মিলাতে পারি না। এত সুদর্শন, স্মার্ট, ক্ষিপ্র গতির জিমন্যাস্ট প্রাণীর নাম কীভাবে গালি হয়ে গেল, তা বোধগম্য নয়।

কিছুটা বানরের মতো দেখতে হলেও উল্লুক বানর গোত্রীয় নয়। সাধারণভাবে উল্লুক বানরের চেয়ে উন্নত, এরা নর-বানর। আকৃতি, গঠন, বুদ্ধিমত্তা কিংবা সামাজিক আচরণে এরা মানুষের কাছাকাছি। আমাদের পরিচিত বানর বা হনুমানের লেজ থাকলেও উল্লুকের লেজ নেই। লেজ না থাকায় অনেক এলাকায় বনমানুষ নামে পরিচিত। আমাদের দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ি বনে এই উল্লুক টিকে আছে। ভারতের আসাম, মিজোরাম ও মিয়ানমারের কিছু বনে দেখা যায়। এ ছাড়া গোটা দুনিয়ার আর কোনো বনাঞ্চলে নেই। আইইউসিএনের লালতালিকায় উল্লুক বিপন্ন প্রাণী।

উল্লুক দেখতে এত সুন্দর যে অন্য বানর প্রজাতিরা এর কাছাকাছি নয়। পুরুষ উজ্জ্বল কালো। গভীর বাদামি চোখের ওপর ধবধবে সাদা আইভ্রু মুখমণ্ডলে দৃষ্টিনন্দন অবয়ব তৈরি করে। স্ত্রী হালকা বাদামি থেকে হলুদাভ বা সোনালি। চোখের চারপাশ ও মুখের অগ্রভাগে সাদা পাউডারের মতো বলয় প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি।

উল্লুকের সারা দেহ লম্বা লোমে আচ্ছাদিত, তবে মুখমণ্ডলে লোম নেই। হালকা সোনালি মায়ের কোলে সোনালি-শুভ্র লোমশ বাচ্চা এলে পরিবারে আনন্দের বন্যা। মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে বাচ্চা লম্বা আঙুল দিয়ে মায়ের লোম আঁকড়ে ধরে স্তনবৃন্ত মুখে নেয়। গাছের ডালে লাফানোর সময় বাচ্চা মায়ের দেহ থেকে ছিটকে পড়ে না।

মা-সন্তানের এমন দৃঢ় বন্ধন প্রাণিজগতে বিরল।

উল্লুকের পারিবারিক জীবন প্রাণিজগতের বিস্ময়। পুরুষ-স্ত্রীর নিবিড় বন্ধন মানুষের সম্পর্ককেও হার মানায়। ছোট দলে বাস করে। এক পুরুষ ও এক স্ত্রী প্রাপ্তবয়স্ক হলে জোড় বেঁধে পরিবার গড়ে। জীবনের ঝড়ঝাপটায়ও একে অপরকে ত্যাগ করে না, সম্পর্ক অটুট থাকে সারাজীবন। ফলে এক দলে একাধিক প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ বা স্ত্রী দেখা যায় না। সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে আশপাশের দলের সমবয়সীর সঙ্গে ভাব বিনিময় করে নতুন সংসার গড়ে। বাবা-মায়ের কাছাকাছি বনাঞ্চলে নিজেদের টেরিটরি স্থাপন করে। এ যেন মানববসতির বুনো সংস্করণ।

উল্লুক মাত্র ২৫ বছর বাঁচে। পূর্ণবয়স্ক আড়াই ফুট লম্বা, ওজন প্রায় সাত কেজি। স্ত্রী কিছুটা ছোট। দেহের তুলনায় হাত-পা লম্বা। লম্বা হাত, হুকের মতো আঙুল ও নমনীয় কাঁধের সন্ধি দিয়ে গাছের ডাল থেকে ডালে দ্রুত চলে। গতি ঘণ্টায় ৫৫ কিলোমিটার হতে পারে।

প্রধান আহার বুনো ফল—চাপালিশ, ডুমুর, কাউফল, বট-পাকুড়, খুদি জাম। শীতকালে ফল কমলে কচি পাতা, ফুল, কুঁড়ি, বাকল বা পোকামাকড় খায়। ফল খেয়ে বীজ ছড়িয়ে বন সৃষ্টি, সম্প্রসারণ ও অঙ্কুরোদ্গমে ভূমিকা রাখে।

নিবিড় বন উল্লুকের আবাস। খণ্ডিত বন বা ঘন প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ছাড়া টিকে না। নব্বইয়ের দশকে চট্টগ্রামের চুনতির বন ছিল উল্লুকের আবাস। কিন্তু বনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় কমিউনিটিকে আস্থায় না নিয়ে চুনতির বনকে বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষণা করায় কয়েক বছরে গাছপালা উজাড় হয়, বাংলাদেশের উল্লুকের বড় পপুলেশন চিরতরে হারায়। বনাঞ্চল রক্ষা না করলে এই বিরল স্মল এইপের বিলুপ্তি অনিবার্য।

এম এ আজিজ, অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়