রমজান মাসের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই অনেক মুসলমানের জীবনে চোখে পড়া একটা ভয়াবহ পরিবর্তন ঘটে। রমজানে যে মসজিদগুলো মুসল্লিতে ঠাসা থাকত, ঈদের পরদিন থেকেই সেগুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়।

যে মানুষটি পুরো মাস মিথ্যা, গিবত বা অনৈতিক কাজ থেকে দূরে ছিলেন, শাওয়ালের চাঁদ ওঠার পরই তিনি আবার পুরনো অভ্যাসে ফিরে যান।

এখানে প্রশ্ন ওঠে, তবে কি আমাদের ইবাদত ও নৈতিকতা কেবল একটি মাসের জন্যই সীমাবদ্ধ? আমরা কি কেবল রমজানের রবের ইবাদত করি, নাকি সারা বছরের রবের?

সমাজের একটি বড় সমস্যা হলো ধর্মকে নির্দিষ্ট কিছু অনুষ্ঠান বা সময়ের ফ্রেমে বেঁধে ফেলা। অনেকে মনে করেন, রমজান মানেই কেবল শুদ্ধ হওয়ার সময়, আর বাকি বছর নিজের ইচ্ছামতো চলার সুযোগ। এই ধারণাটি ইসলামি দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত।

একটি বিশাল জনগোষ্ঠী মাত্র ৩০ দিনের জন্য নিজেদের নফস বা প্রবৃত্তিকে জয় করার পর আবার পরাজয় বরণ করে, তখন সেই জাতির পক্ষে বড় কোনো বিজয় অর্জন করা কঠিন।

রমজান শেষ, আমলও কি শেষ।

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সাপ্তাহিক জুমা এবং বার্ষিক হজের মাধ্যমে মানুষকে সারাবছরই একটি আধ্যাত্মিক কাঠামোর মধ্যে রাখে। রমজান ছিল এই কাঠামোর একটি নিবিড় প্রশিক্ষণকাল মাত্র।

আলেমরা বর্তমান সময়ের এই অদ্ভুত অবস্থাকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। একদল হলো ‘রমজানি’—যারা কেবল রমজান এলেই ধার্মিক হয় এবং মাস শেষ হলে ধর্মকে বিদায় জানায়। অন্যদল হলো ‘রব্বানি’—যারা সবসময় আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ অনুসরণ করে।

বিখ্যাত আলেম শেখ মুহাম্মদ সালেম ইবনে আবদুল ওয়াদুদকে (রহ.) একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, শয়তানদের কখন মুক্তি দেওয়া হয়? তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘ঈদের নামাজের পরপরই; কারণ এরপরই মানুষের আচরণে ব্যাপক বিচ্যুতি দেখা যায় এবং মসজিদগুলো খালি হয়ে যায়।’

রমজানে শেষ নয় রোজা।

যদি রমজানের পর আমাদের আচরণে কোনো পরিবর্তন না আসে, তবে বুঝতে হবে আমাদের রোজা কেবল উপবাসই ছিল, তা আত্মিক পরিবর্তনের ছোঁয়া পায়নি।

জাতির এই চারিত্রিক বৈপরীত্য আমাদের সামষ্টিক অগ্রগতির পথে বড় বাধা। যখন একটি বিশাল জনগোষ্ঠী মাত্র ৩০ দিনের জন্য নিজেদের নফস বা প্রবৃত্তিকে জয় করার পর আবার পরাজয় বরণ করে, তখন সেই জাতির পক্ষে বড় কোনো বিজয় অর্জন করা কঠিন।

ইতিহাসের সোনালি সময়ের মুসলিমরা ‘রমজানি’ ছিলেন না, তারা ছিলেন ‘রব্বানি’। তাদের ইবাদত ও নৈতিকতা কোনো ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না বলেই তারা বিশ্বজয়ী হতে পেরেছিলেন।

রমজান আমাদের যে উন্নত চরিত্র ও সহনশীলতার শিক্ষা দিয়েছে, তা ঈদের দিনেই বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। রমজানের পবিত্রতা ধরে রাখা মানেই হলো পরবর্তী ১১ মাস সেই শিক্ষার প্রতিফলন ঘটানো।

যদি রমজানের পর আমাদের আচরণে কোনো পরিবর্তন না আসে, তবে বুঝতে হবে আমাদের রোজা কেবল উপবাসই ছিল, তা আত্মিক পরিবর্তনের ছোঁয়া পায়নি।

রমজান আমাদের জন্য একটি সূচনাবিন্দু হওয়া উচিত, শেষ বিন্দু নয়। প্রকৃত সফল সেই ব্যক্তি, যার রমজান পরবর্তী জীবন রমজানের চেয়েও সুন্দর ও মার্জিত হয়।

শুধু রমজান নয়, মৃত্যু পর্যন্ত ইবাদত।