ইরানে স্থল অভিযানের লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ১০ হাজার সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন। সেখানে এখন প্রায় তিন হাজার মার্কিন প্যারাট্রুপার এবং পাঁচ হাজার মেরিন সেনা সরাসরি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছেন।

কিন্তু যুদ্ধবিশেষজ্ঞরা ট্রাম্প প্রশাসনের এই পরিকল্পনাকে 'হাস্যকর' আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে, ইরানে সামরিকভাবে সফলতা অর্জন করতে হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় সবাইকেই সেখানে মোতায়েন করতে হতে পারে। মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীতে বর্তমানে ১৩ লাখের বেশি সদস্য রয়েছেন।

ইরাক ও আফগানিস্তানের তিক্ত অভিজ্ঞতা

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০০৩ সালের ২০ মার্চ ইরাকে হামলা শুরু করেন। ২০০৭-০৮ সালে যখন ইরাক যুদ্ধ তুঙ্গে, তখন সেখানে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর সেনা মোতায়েন ছিলেন। সাদ্দাম হোসেনের পতনের চার বছর পর গড়ে ওঠা বিদ্রোহ দমনের জন্যই এত বিপুল সংখ্যক সেনা সেখানে ছিল। এছাড়া সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ ইরাকি সরকারি সেনাও যোগ দিয়েছিলেন।

তবুও আল-কায়েদা ও সাদ্দামের বাথ পার্টির কিছু সদস্য নিয়ে গঠিত তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (আইএস) ২০১৪ সালে ইরাকের উত্তরাঞ্চলের বড় অংশ দখল করে নেয়। এর ফলে বোঝা যায়, অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে টালমাটাল ইরাক স্থিতিশীল করতে সাড়ে সাত লাখ সেনাও যথেষ্ট ছিল না। অথচ ইরান আয়তন ও সামরিক শক্তিতে ইরাকের চেয়ে অনেক গুণ উন্নত।

অভিযানের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য না থাকলে এই যুদ্ধ ব্যর্থ হতে বাধ্য। এখন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এ যুদ্ধের পেছনে কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক বা সামরিক উদ্দেশ্য নেই।
স্যার নিক বোরটন, ইরাক ও আফগান যুদ্ধের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাবেক ব্রিটিশ লেফটেন্যান্ট জেনারেল

পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে এখন ৫০ হাজার সেনা, নাবিক ও বিমানসেনা অবস্থান করছেন। তারা ইরাকে বোমাবর্ষণ এবং তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে ব্যস্ত। ট্রাম্প প্রশাসন সেখানে মোট অতিরিক্ত ২০ হাজার সেনা পাঠানোর চিন্তা করছে।

হেলমান্দ ও ইরানের ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ: একটি অসম তুলনা

২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশে মিত্রবাহিনীর সর্বোচ্চ সেনা মোতায়েন হয়। যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বাধীন অভিযানে সেনাসংখ্যা ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার বাড়ানো হলেও অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। পরে স্থিতি সামাল দিতে সেখানে অতিরিক্ত ২৫ হাজার মার্কিন মেরিন সেনা পাঠানো হয়।

আশ্চর্যের বিষয়, ৩৫ হাজার মার্কিন ও ব্রিটিশ সেনার বিশাল বাহিনীও হেলমান্দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। অথচ এই অঞ্চল ইরানের আয়তনের মাত্র ২৮ ভাগের এক ভাগ।

এদিকে প্রায় ৯ কোটি মানুষের ইরানের আয়তন পশ্চিম ইউরোপের সমান। এমন দেশে স্থল অভিযানের জন্য যে সংখ্যক মার্কিন সেনা পাঠানোর কথা ভাবা হচ্ছে, তা হেলমান্দে পাঠানো সেনার চেয়েও কম।

ন্যাটোর সাবেক কয়েকজন জেনারেলও মনে করেন, ইরানে স্থলযুদ্ধে সফল হতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘১০ লাখের বেশি’ সেনা সেখানে পাঠাতে হবে।

খারগ দ্বীপ: ছোট লক্ষ্য কি বড় যুদ্ধের ফাঁদ

পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী দুই ইউনিট—৩১ ও ১১তম মেরিন এক্সপিডিশনারি ইউনিট (এমইইউ) অবস্থান করছে। ইউএসএস ত্রিপোলি ও ইউএসএস বক্সার নামক দুটি ছোট রণতরিকাকে কেন্দ্র করে গঠিত এই ইউনিটগুলো মার্কিন 'অ্যাটাক ডগ' বা দুর্ধর্ষ আক্রমণকারী দল হিসেবে পরিচিত। প্রতিটিতে প্রায় আড়াই হাজার সেনা রয়েছে।

এগুলো ইরানের তেল রপ্তানির কেন্দ্র খারগ দ্বীপের মতো লক্ষ্য দখলের জন্য উপযোগী। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইতিমধ্যে এই দ্বীপে হামলার হুমকি দিয়েছেন।

এছাড়া হরমুজ প্রণালির ২১ মাইল প্রশস্ত জলসীমায় জাহাজের উপর ইরানের হুমকি মোকাবিলায়ও এই ইউনিটগুলো ব্যবহারযোগ্য। প্রথম পর্যায়ে তারা সফল হতে পারে, কিন্তু এই সাফল্য কতদিন টিকবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

ইরানে স্থলযুদ্ধে সফল হতে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ লাখ সেনা লাগবে, কয়েক হাজার পাঠানো ‘হাস্যকর’

পুতিনের ড্রোন ও লক্ষ্যহীন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ

সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পরীক্ষিত 'ফার্স্ট পারসন ভিউ' (এফপিভি) ড্রোনগুলো পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এসব ড্রোন ইরানকে সরবরাহ করবেন। তখন ঝাঁকে ঝাঁকে ইরানি ড্রোন মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা চালিয়ে সেই দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করতে পারে।

ইরাক ও আফগান যুদ্ধের অভিজ্ঞ লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্যার নিক বোরটনের মতে, ইরানে স্থল অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের 'কয়েক লাখ' সেনা প্রয়োজন। ন্যাটোর সাবেক কয়েকজন জেনারেলও বলছেন, সফলতার জন্য '১০ লাখের বেশি' সেনা লাগবে।

নিক বোরটন সতর্ক করে বলেন, সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া যুদ্ধ ব্যর্থ হবে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধের পেছনে এখনো কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক বা সামরিক লক্ষ্য দেখা যায়নি। তবে ইসরায়েল ইরানের 'শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন' চাইছে।