যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর হামলাকে সাধারণত কৌশলগত পরিভাষায় বর্ণনা করা হয়, যেমন প্রতিরোধ, উত্তেজনা বৃদ্ধি, সামরিক চাপ, ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা এবং পারমাণবিক ঝুঁকি। এসব পরিভাষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও পুরো বাস্তবতা প্রকাশ করে না।
এই যুদ্ধে ইরান কীভাবে টিকে থাকতে পারে, তা বোঝার জন্য সামরিক হিসাবের বাইরে তাকাতে হবে। দেখতে হবে সেই নৈতিক জগতের দিকে, যা দিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ক্ষমতা, ক্ষয়ক্ষতি এবং টিকে থাকার বিষয়টি বুঝে।
ইরান কোনো সাধারণ রাষ্ট্র নয়। এর আদর্শিক ভিত্তি দীর্ঘদিন ধরে শিয়া রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের শাহাদাত, আত্মত্যাগ ও পবিত্র প্রতিরোধের ধারণার ওপর গড়ে উঠেছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুদ্ধে শুধু অস্ত্র নয়, বয়ান ও মূল্যবোধের ব্যাখ্যাও রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
পবিত্র রমজান মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে কট্টরপন্থীরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শোকানুষ্ঠান করছে, এমনকি বোমাবর্ষণ অব্যাহত থাকলেও। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অনুগতরা, বিশেষ করে আধা সামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’-এর সদস্যরা, একজন ঐশী জ্ঞান দ্বারা পরিচালিত আলেমের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ‘শহীদ’ হতে প্রস্তুত।
এর মানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র সুরক্ষিত, তা নয়। বরং পরিস্থিতি জটিল ও উদ্বেগজনক। বাইরের হামলা হয়তো এটিকে শত্রুরা যতটা দুর্বল করতে চায়, ততটা পারবে না। বরং এটি সেই প্রতীকী ও নৈতিক বয়ানকে জাগিয়ে তুলবে, যা দিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র কয়েক দশক ধরে টিকে আছে এবং দেশে-বিদেশে নিজেদের দমন-পীড়নকে বৈধতা দিয়ে আসছে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র শুরু থেকেই নিজেকে একটি নৈতিক প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যা পবিত্র ইতিহাসের সঙ্গে সার্বভৌমত্বকে একীভূত করেছে। এর মূল আবেগ ও প্রতীক শিয়া মুসলিমদের স্মৃতিতে রয়েছে, বিশেষ করে ৬৮০ সালের কারবালার প্রান্তরে। সেখানে উমাইয়া বাহিনীর হাতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হোসাইন (রা.) ও তাঁর ক্ষুদ্র অনুসারী দল নির্মমভাবে শহীদ হয়েছিলেন।
শিয়া ঐতিহ্যে এই ঘটনা অন্যায্য ক্ষমতারোহণ, নির্দোষের ভোগান্তি, ন্যায়সংগত প্রতিরোধ ও মুক্তির জন্য আত্মত্যাগের প্রতীক। এটি বিশ্বাসীদের মনে করিয়ে দেয় যে নিপীড়ন পরাজয় নয়, ভোগান্তি সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো হতে পারে এবং মৃত্যু কালের সাক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বোঝাপড়ায় শাহাদাত কেন্দ্রীয় মূল্যবোধ। বছরের পর বছর শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ন্যায়ের পক্ষে ভুক্তভোগী এবং সাম্রাজ্যবাদ (ইস্তেকবার), আধিপত্যবাদ, অবমাননা ও বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পবিত্র সংগ্রামের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে বৈধতা অর্জন করে আসছে।
আত্মত্যাগের পবিত্রতার ওপর গড়ে ওঠা এই রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক ব্যবস্থা যেকোনো আক্রমণকে নিজের নৈতিক জগতে মানিয়ে নিতে পারে। বাইরে থেকে ধ্বংসযজ্ঞ যা বলে, ভেতরে তা কালের সাক্ষী, সহনশীলতা ও বিশ্বস্ততার বয়ান হয়ে ওঠে, যেখানে মৃত্যু রাজনৈতিক অর্জন।
বর্তমান যুদ্ধে ইরানের কৌশল দম ধরে রাখা এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা—শত্রুদের চেয়ে বেশি দিন টিকে থাকা, আঘাত সামলানো, জ্বালানি ব্যাহত করা এবং ওয়াশিংটন ও মিত্রদের রাজনৈতিক সংকল্প ভাঙার বাজি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিমান হামলার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরান সরকার ভেতর থেকে ভেঙে পড়ার লক্ষণ দেখায়নি।
আট বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধ টিকে থাকার ও আত্মত্যাগের সংস্কৃতি রেখে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী বাইরের চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতাও যুক্ত, যদিও ইরানিদের বিপুল মানবিক মূল্য চুকাতে হয়েছে।
সব সংহতি ধর্মতাত্ত্বিক নয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ঘৃণাকারী অনেক ইরানিও বিদেশি হামলার বিরোধিতা করতে পারেন জাতীয়তাবাদ ও যুদ্ধের ভয়ে। বিদেশি সহিংসতা দেশের ভেতরের নৈতিক সীমা ঝাপসা করে, জনপরিসর সংকুচিত করে, অবরুদ্ধ মানসিকতা বাড়ায় এবং রাষ্ট্রকে জাতির রক্ষক হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ দেয়।
অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ বিদেশি হুমকিতে প্রতিস্থাপিত হলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র লাভবান হয়। শান্তিকালে দুর্নীতি, দমন, অর্থনৈতিক পতন উন্মোচিত হয়; কিন্তু যুদ্ধে এটি প্রতিরোধের রক্ষক হয়ে ওঠে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধর্মতত্ত্ব সর্বজনীনভাবে সম্মতি উৎপাদন করে না। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ইঙ্গিত দেয়, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কমে আসা অনুগত গোষ্ঠী ও বৈধতার প্রশ্নের মুখোমুখি। অনেক ইরানি রাষ্ট্রের পবিত্র বয়ানে বিশ্বাস হারিয়েছে। তবে রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বের জন্য সর্বজনীন বিশ্বাস লাগে না; পর্যাপ্ত বিশ্বাসী, প্রতিষ্ঠান, আচার, ভয় ও যুদ্ধ যথেষ্ট।
এটাই যুদ্ধকে নৈতিক-রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি প্রবল শক্তি দিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ‘অর্থ’ মুছে ফেলতে চায়, তবে এর রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক ব্যবস্থা বুঝতে ভুল করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ দাবি উত্তেজনা বাড়ায় এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে বহিঃশত্রু প্রদান করে, যাকে তারা বয়ানে ব্যবহার করতে জানে।
ধর্মনিরপেক্ষ কৌশলে সহিংসতা শক্তি ধ্বংস করে; কিন্তু রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তায় এটি পবিত্র উদ্দেশ্যকে শক্তিশালী করে। মতাদর্শিক রাষ্ট্র ‘পবিত্র প্রতিরোধ’-এর আয়নায় নিজেকে দেখে; কমান্ডার, অবকাঠামো হারালেও ‘শাহাদাতের’ নতুন বয়ান অর্জন করে।
মতাদর্শিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ট্র্যাজেডি হলো, বাইরের আক্রমণ তাদের টিকে থাকার আখ্যান পুনরুদ্ধার করে।
এসবের অর্থ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নির্মমতা অস্বীকার বা ধর্মতত্ত্ব মহিমান্বিত করা নয়। এটি নেতিবাচক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু বোঝার জন্য দেখতে হবে তাদের মানিয়ে নেওয়ার প্রতীকী সক্ষমতা, যা ক্ষতিকে নৈতিক কর্তৃত্বে রূপান্তর করে।
ধর্মীয় মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ভোগান্তিকে রাজনৈতিক রূপ দেয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্র পাল্টা আঘাতে বা আক্রমণ সহ্য করে শক্তিশালী হয়।
এই হামলা রাষ্ট্রের বস্তুগত ভিত্তি দুর্বল করলেও পবিত্র বয়ানকে পুষ্ট করবে, যার ওপর এটি টিকে আছে।
লেখা: হোসেন দাব্বাক, সহকারী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, লন্ডন






