ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার তীব্রতা তিন সপ্তাহ শেষেও কমেনি। শিগগিরই এই যুদ্ধ বন্ধের কোনো ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত তেল-গ্যাসসমৃদ্ধ খারগ দ্বীপ দখল নয়তো হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে স্থলসেনা পাঠানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত মার্কিন সেনা মোতায়েনের খবরের মধ্যে দুই নেতা থেকে এমন বার্তা দেওয়া হলো।
তবে অব্যাহত হুমকি, হামলা ও শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হারানোর পরও অনমনীয় অবস্থানে রয়েছে ইরান। নেতানিয়াহুর হুমকির পরদিন গতকাল শুক্রবার ইসরায়েলে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরানের সামরিক বাহিনী। মধ্য ইসরায়েলের তেল আবিবে একটি ভবনে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। জেরুজালেমের ওল্ড সিটিতে একটি পার্কিং লটে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আগুন ধরে যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে কয়েকজন ইসরায়েলি আহত হয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের খারগ দ্বীপ দখলের পরিকল্পনার কথা জানা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর প্রতিবেদনে। ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘তিনি (ট্রাম্প) চান হরমুজ প্রণালি খোলা থাকুক। এটা নিশ্চিত করতে যদি খারগ দ্বীপ দখলের প্রয়োজনও হয়, সেটি করা হবে। যদি তিনি নৌপথে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন, সেটিও হবে। তবে এখনো সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।’
.খারগ পারস্য উপসাগরে অবস্থিত পাঁচ বর্গমাইল আয়তনের এক দ্বীপ। ইরানের উপকূল থেকে এর দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। এটি ইরানের সবচেয়ে বড় জ্বালানি কেন্দ্র। ইরান যে জ্বালানি রপ্তানি করে, তার ৯০ শতাংশই যায় এখান থেকে। এর আগেও দ্বীপটিতে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। নিশানা করা হয়েছিল এর জ্বালানি স্থাপনাকেও।
ট্রাম্পসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেক প্রেসিডেন্টের সময় সামরিক সংঘাতে মার্কিন স্থলবাহিনী পাঠানোর বিষয়টি উল্লেখ করেন ট্রাম্প প্রশাসনের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক প্রেসিডেন্টের আমলেই সংঘাতে আমাদের সব সময়ই স্থলবাহিনীর উপস্থিতি ছিল। আমি জানি, বিষয়টি গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত। এর রাজনৈতিক দিকটাও আমি বুঝি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) শেষ পর্যন্ত যেটা সঠিক মনে করবেন, সেটাই হয়তো করবেন তিনি।’
.এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, যুদ্ধে তারা (যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল) জয়ী হতে যাচ্ছে। আর নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে ইরান। তিনি বলেন, ‘মানুষ যা ভাবছে, তার চেয়েও দ্রুত যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটছে। প্রায়ই বলা হয়, শুধু আকাশপথে আপনি জিততে পারবেন না, আকাশ থেকে বিপ্লব ঘটানো যায় না। এটা সত্য। আকাশ থেকে অনেক কিছু করা যায়। আমরা তা করছিও। তবে এর সঙ্গে স্থলে উপস্থিতি থাকা প্রয়োজন।’
তবে খারগ দ্বীপ দখলে নিতে হলে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁরা বলছেন, শুধু বিশেষ বাহিনীকে অভিযানে পাঠিয়ে এটা সম্ভব হবে না। যুক্তরাষ্ট্র এটা যদি করতে পারে, তাহলে তেহরানের ওপর প্রভাব বাড়বে। কিন্তু এমন পদক্ষেপ হবে আত্মঘাতী।
চিন্তন প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষক নিল কুইলিয়াম বলেন, ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র এটি দখল করে, তাহলে কার্যত ইরানের তেলশিল্প বিচ্ছিন্ন হবে। ইরান উৎপাদন করবে, কিন্তু রপ্তানি করতে পারবে না। এটা হলে জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হবে। এতে সংকট আরও বেড়ে যাবে।’
.ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে দেশটির রাজধানী তেহরানে। হামলা হয়েছে আরও কিছু শহরেও। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মুখপাত্র জেনারেল আলী মোহাম্মদ নায়িনি নিহত হয়েছেন।
গতকাল আইআরজিসির পক্ষ থেকে জেনারেল নায়িনি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়। এর আগে তাঁকে হত্যার দাবি করেছিল ইসরায়েল। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিমের খবর অনুযায়ী, গতকাল ভোরে এ হামলা চালানো হয়। তবে কোথায় এ হামলা হয়েছে, তা জানানো হয়নি।
আইআরজিসির মুখপাত্র হওয়ার আগে বিভিন্ন উচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন জেনারেল নায়িনি। তিনি ইরানের আধা সামরিক বাহিনী বাসিজ রেজিসট্যান্স ফোর্সের সংস্কৃতিবিষয়ক উপকমান্ডারের পাশাপাশি আইআরজিসির সংস্কৃতিবিষয়ক উপকমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
.ইরানের আধা সামরিক বাসিজ বাহিনীর গোয়েন্দাপ্রধান ইসমাইল আহমাদিকেও হত্যার দাবি করেছে ইসরায়েল। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে তেহরানে এক বিমান হামলায় তিনি নিহত হন বলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে। ইরানের আরেকজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাকেও হত্যার দাবি করেছে তারা। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানায়, তেহরানে দুই দিন আগে বিমান হামলায় নিহত হন ওই কর্মকর্তা। তবে তাঁর নাম জানানো হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ইরানের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের অনেকে নিহত হয়েছেন। গতকাল দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বার্তায় অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শুত্রু মোকাবিলায় সতর্ক থাকতে বলেছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে দেশ দুটির সামরিক অবস্থানে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। গতকাল কুয়েতের আরও একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালায় তেহরান। ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের কথা জানায় সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাহরাইনেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির এক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সৌদি আরব অন্তত ২০টি ড্রোন ও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করছে।
.ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড খারগ দ্বীপে মার্কিন হামলা.হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের ঘাঁটিতে জরুরি অবতরণ করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-৩৫ মডেলের যুদ্ধবিমান। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করছে তারা। যদি ঘটনা সত্যি হয়, তাহলে যুদ্ধে ইরানের হামলায় মার্কিন যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রথম ঘটনা হবে এটি।
এদিকে চলমান যুদ্ধের কারণে ইরাকে চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানে ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের হামলা এবং তাদের অবস্থানে পাল্টা মার্কিন হামলার কারণে দেশটিতেও যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এই অবস্থায় ইরাকে থাকা সেনাদের সাময়িক প্রত্যাহার করে নিয়েছে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো। ইরাকের একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা এ কথা জানিয়েছেন।
যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ‘বাস্তবতা বিবর্জিত’ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ঠিক যখন মার্কিন কর্তৃপক্ষ দাবি করছে যে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে, তখনই একটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান আক্রান্ত হচ্ছে। যখন তারা ইরানের নৌবাহিনীকে শেষ বলে ঘোষণা করছে, তখন মার্কিন রণতরি ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড ঘাঁটিতে ফিরে যাচ্ছে এবং ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন আরও দূরে সরে যাচ্ছে।
.যুদ্ধে অংশ নিতে মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা ও যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল রয়টার্স ও মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে’ মধ্যপ্রাচ্যে যাবেন যুক্তরাষ্ট্রের চার হাজার মেরিন সেনা ও নাবিক।
নিউজম্যাক্সের দেওয়া খবর অনুযায়ী, সামরিক উপস্থিতি জোরদারে মধ্যপ্রাচ্যে যাবে যুদ্ধজাহাজের বহর। এই বহরে হামলা চালানোর জন্য বিশেষভাবে তৈরি যুদ্ধজাহাজের পাশাপাশি উভচর যুদ্ধযানও থাকবে। আরও থাকবে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান। সেনার মধ্যে ২ হাজার ৫০০ জন মেরিন।
সেনা ও যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলেও কী লক্ষ্য নিয়ে তাদের মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে, সামরিক কর্মকর্তাদের সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
.এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবহার করতে দেওয়া নিয়ে যুক্তরাজ্যকে সতর্ক করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেতে কুপারের সঙ্গে ফোনালাপে বলেছেন, ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিলে তা হবে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার শামিল।
একদিকে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করা আর অন্যদিকে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্তে চলমান সংঘাত নিয়ে অস্পষ্টতা বাড়ছে। তবে ট্রাম্প এখন ইরানের বিরুদ্ধে নিজেদের জয়ী ঘোষণা করে যুদ্ধ থেকে কোনোভাবে বের হয়ে যেতে চাইছেন বলে মনে করেন ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান কুইনসি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্র্যাফটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প ক্রমেই উপলদ্ধি করতে পারছেন যে যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষভাবে ভালো যাচ্ছে না। পাশাপাশি তিনি এটাও বুঝছেন যে তাঁর সব ধরনের উত্তেজনা বাড়ানোর বিকল্পই বেশ সমস্যাজনক। কারণ, এ বিকল্পগুলো বেছে নিলে তাতে ইরানের ওপর যেমন চাপ বাড়বে, তেমনি চাপে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রও।






