একটি সাত-আট বছরের শিশু যখন প্রশ্ন করে, “মা, আল্লাহ কোথায়? আমি কেন তাঁকে দেখতে পাই না?”—তখন অনেক অভিভাবকই কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।
কেউ হয়তো বাতাস বা অক্সিজেনের উদাহরণ দেন, কিন্তু সব শিশু কেবল এতে সন্তুষ্ট হয় না। শিশুদের মন জন্মগতভাবেই কৌতূহলী এবং তারা যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা পছন্দ করে।
বিশেষ করে বর্তমানের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে শিশুরা অনেক বেশি সচেতন, তাই তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় সাধারণ বা গৎবাঁধা উত্তরের চেয়ে যৌক্তিক ও হৃদয়স্পর্শী আলোচনার প্রয়োজন বেশি।
সন্তানকে আল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া কেবল একটি তথ্য প্রদান নয়, বরং এটি তার অন্তরে বিশ্বাসের এক মজবুত ভিত্তি স্থাপনের প্রক্রিয়া।
ইসলামি জীবনদর্শনে শিশুকে সাত বছর বয়স থেকে নামাজের নির্দেশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর পরিচয় তার অন্তরে তারও অনেক আগে থেকে গেঁথে দেওয়া উচিত।
১ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং অভ্যাসের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া কার্যকর। যেমন:
দোয়ার মাধ্যমে পরিচয়: খাওয়ার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ এবং শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা কিংবা বৃষ্টির শব্দ শুনলে 'সুবহানাল্লাহ' বলা—এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো শিশুর অবচেতন মনে আল্লাহর অস্তিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে।
আচরণগত শিক্ষা: শিশুরা যা শোনে তার চেয়ে যা দেখে তা দ্রুত শেখে। অভিভাবকরা যখন উচ্চৈঃস্বরে জিকির করেন বা দোয়া করেন, শিশুরা তা নকল করার চেষ্টা করে। এটি তাদের মনে এই ধারণা দেয় যে, আমাদের ঊর্ধ্বে এমন একজন সত্তা আছেন যার কাছে আমরা সাহায্য চাই।
ইমাম গাজালি (রহ.) তাঁর আইয়্যুহাল ওয়ালাদ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, শৈশব হলো কাদা মাটির মতো, এই সময়ে শিশুকে যেভাবে গঠন করা হবে, সেভাবেই তার ভবিষ্যৎ ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠবে (পৃষ্ঠা: ৪৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২০০৫)
যখন শিশু সরাসরি প্রশ্ন করে যে সে কেন আল্লাহকে দেখতে পায় না, তখন তাকে কিছু বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যেতে পারে:
১. স্রষ্টা ও সৃষ্টির উদাহরণ: তাকে জিজ্ঞেস করুন, “এই যে আমাদের টেলিভিশন বা গাড়িগুলো দেখছো, এগুলো কি নিজে নিজে তৈরি হয়েছে?” সে উত্তর দেবে, “না।”
তখন তাকে বলুন, “তেমনি এই বিশাল পৃথিবী, সূর্য এবং তারকারাজিও কেউ একজন তৈরি করেছেন। আমরা সবসময় নির্মাতাকে দেখতে পাই না, কিন্তু তাঁর তৈরি কাজ দেখে বুঝতে পারি যে তিনি আছেন।”
২. নিয়ন্ত্রক ও অদৃশ্যের যুক্তি: তাকে সিসিটিভি ক্যামেরার উদাহরণ দিন। আমরা রাস্তায় ক্যামেরা দেখি, কিন্তু সেই ক্যামেরাগুলো যারা নিয়ন্ত্রণ করছেন সেই পুলিশ বা প্রকৌশলীদের আমরা সবসময় দেখতে পাই না।
কিন্তু আমরা জানি যে কেউ একজন মনিটরে আমাদের দেখছেন এবং সব নিয়ন্ত্রণ করছেন। একইভাবে আল্লাহ তাআলা আমাদের দেখেন এবং মহাবিশ্ব পরিচালনা করেন, যদিও আমরা তাঁকে এই চোখে দেখতে পাই না।
৩. সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা: শিশুকে বোঝান যে আমাদের চোখের দেখার একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতা আছে। যেমন আমরা খুব দূরের জিনিস দেখি না বা খুব ছোট জীবাণু দেখতে পাই না।
আল্লাহ এত মহান এবং তাঁর নূর এত প্রখর যে এই দুনিয়ার চোখ দিয়ে তাঁকে দেখার ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে জান্নাতে ইনশাআল্লাহ মুমিনরা আল্লাহকে দেখতে পাবে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “দৃষ্টিসমূহ তাঁকে আয়ত্ত করতে পারে না, অথচ তিনি সকল দৃষ্টিকে আয়ত্ত করেন।” (সুরা আনআম, আয়াত: ১০৩)।
আপনার সন্তানের আত্মিক উন্নতির জন্য আপনি নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করতে পারেন:
দলগত ইবাদতে অংশগ্রহণ: বাড়িতে যখন জামাতে নামাজ হবে, তখন আপনার ছেলেকে আজান বা ইকামতের দায়িত্ব দিন। সাত বছর বয়স হলে তাকে মাঝে মাঝে ইমামতি করার উৎসাহ দিন (যদি সে প্রয়োজনীয় সুরা জানে)। এতে তার মধ্যে ধর্মীয় আত্মবিশ্বাস বাড়বে।
গল্পের ছলে শিক্ষা: শোয়ার সময় তাকে নবী-রাসুলদের গল্প এবং কোরআনের শিক্ষামূলক কাহিনী শোনান। বর্তমান যুগে ভালো মানের অ্যানিমেটেড ইসলামিক ভিডিও পাওয়া যায়, যা পরিবারের সবাই মিলে দেখতে পারেন। তবে ভিডিও দেখার পর তাকে প্রশ্ন করার সুযোগ দিন এবং ধৈর্য সহকারে উত্তর দিন।
সঙ্গী নির্বাচন: সমবয়সী মুসলিম শিশুদের নিয়ে একটি ছোট ‘হালাকা’ বা পাঠচক্র তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে তারা ফেরেশতা, আখলাক এবং নবীদের জীবন নিয়ে আলোচনা করবে। সমবয়সীদের সঙ্গে আলোচনা করলে শিশুদের শেখার আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়।
আল্লাহর রাসুল (সা.) শিশুদের সঙ্গে অত্যন্ত কোমল আচরণ করতেন এবং তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতেন।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) যখন ছোট ছিলেন, তখন নবীজি (সা.) তাকে বলেছিলেন, “হে বৎস, তুমি আল্লাহর হুকুম রক্ষা করো, তবে আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন...” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬)
এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে শিশুদের গভীর আধ্যাত্মিক কথা সহজ ভাষায় শেখানো সম্ভব।
স্কুল বা বাইরের পরিবেশ থেকে শিশুরা অনেক সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ে আসতে পারে। তারা বিবর্তনবাদ বা অন্য কোনো সংশয়ী ধারণা নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে। এই অবস্থায় কখনোই বিরক্ত হওয়া বা রাগ করা চলবে না।
তাদের কথা মন দিয়ে শুনুন, হোক তা হাস্যকর বা অদ্ভুত। যুক্তির মাধ্যমে তাদের ভুলগুলো সংশোধন করে দিন। মনে রাখবেন, বিশ্বাসের এই লড়াইয়ে আপনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ধৈর্য এবং মমতা।
শিশুদের কৌতূহল দমানোর চেষ্টা করবেন না, বরং তাকে প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিচালনা করুন। আল্লাহকে ভালোবাসতে শেখানোই হলো প্রকৃত শিক্ষা। যখন সে জানবে যে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন এবং সর্বদা তার সঙ্গে আছেন, তখন তার মনে এক ধরনের নিরাপত্তা ও শান্তি তৈরি হবে।
অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো সন্তানের জন্য আল্লাহর সঙ্গে একটি গভীর ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত করে দেওয়া। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.) বলেছেন, “সন্তানের হৃদয়ে স্রষ্টার ভালোবাসা প্রোথিত করাই হলো সর্বোত্তম উত্তরাধিকার।” (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ২/৪১২)






