অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রেষণে নিয়োগ পাওয়া পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহমুদ হাসানের বিরুদ্ধে বহুমাত্রিক অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে (এলজিআরডি) সম্প্রতি জমা পড়া তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অবৈধ পদায়ন ও বদলি, নিয়োগ-বাণিজ্য, গাড়ি ও ভবন কেনায় দুর্নীতি।

অভিযোগ তদন্তের জন্য এলজিআরডির পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ কুমার মহোত্তম। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অধীন একটি সংস্থা হচ্ছে পিডিবিএফ। এমডির বিরুদ্ধে পিডিবিএফের জামালপুর অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ মাঠ কর্মকর্তা গণেশ চন্দ্র সরকারের করা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তার আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গত ১৫ ফেব্রুয়ারি মাহমুদ হাসানকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে বদলি করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ ফেব্রুয়ারি পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ তাঁকে অবমুক্ত করার জন্য আদেশ দেয়। নতুন এমডি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত পিডিবিএফের পরিচালক পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পান এ বিভাগের যুগ্ম সচিব সুব্রত কুমার সিকদার। কিন্তু মাহমুদ হাসান সময় চেয়ে আবেদন করায় বিভাগটি পরে তাঁর অবমুক্তির সময় ৩ মার্চ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়।

.

মাহমুদ হাসান তৃতীয় গ্রেডের একজন যুগ্ম সচিব। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের শুনানি হওয়ার নির্ধারিত তারিখ ছিল। কিন্তু ‘অনিবার্য কারণ’ দেখিয়ে এ শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয় আজ বুধবার। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি পেছনের তারিখ দিয়ে শুনানির নতুন দিন ও সময় জানিয়ে দেওয়া হয় দুজনকে। আজ বুধবার বেলা ১১টায় সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনের ৬৪৬ নম্বর কক্ষে মাহমুদ হাসানকে সুষ্ঠু তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণ, তথ্য-উপাত্ত, কাগজপত্র ও লিখিত বক্তব্য নিয়ে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে।

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ কুমার মহোত্তম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘যথাসময়ে শুনানি হবে এবং আশা করছি অভিযুক্ত ব্যক্তি উপস্থিত থাকবেন।’

পিডিবিএফ ১৯৯৯ সালের ১০ নভেম্বর প্রণীত আইনের মাধ্যমে পরিচালিত সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর যুগ্ম সচিব মাহমুদ হাসানকে প্রেষণে পিডিবিএফের পরিচালক পদে নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। চার দিনের মাথায় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ একই বছরের ২২ অক্টোবর অফিস আদেশ দিয়ে মাহমুদ হাসানকে নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ভারপ্রাপ্ত এমডির দায়িত্ব দেয়।

জানতে চাইলে যুগ্ম সচিব সুব্রত কুমার সিকদার মুঠোফোনে গতকাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মাহমুদ হাসান গতকাল অবমুক্ত হয়েছেন।

.

ভুয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি!

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২২তম বিসিএসের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান, তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি সমন্বিত তালিকায় মাহমুদ হাসানের পিতার নাম আলহাজ আব্দুল খালেক বিশ্বাসের নাম রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর বিষয়টি খতিয়ে দেখার অভিযোগ জমা পড়েছে।

আবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, মাহমুদ হাসানের পিতা আলহাজ আবদুল খালেক বিশ্বাস যদি প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা হন, তাহলে তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের আগেই পবিত্র হজ পালন করেছেন? সেটি কোন সালে? মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানায়, সর্বশেষ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার তালিকায় তাঁর পিতার নাম নেই। মন্ত্রণালয় পুরো বিষয়টির তদন্ত শুরু করেছে।

.

আরও যত অভিযোগ

২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিডিবিএফের ১০০তম পর্ষদ বৈঠকে পিডিবিএফের ভবন কেনা, নিবন্ধন ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ১৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা দিয়ে কেনা হয় ভবন, যার মধ্যে আনুষঙ্গিক খরচসহ নিবন্ধন ব্যয় হয় ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। জানা গেছে, ভবন কেনায় কমিশন বাবদ ৬০ লাখ টাকা নিয়েছেন মাহমুদ হাসান।

এ ছাড়া নীতিমালার বাইরে গাড়ি কিনেছেন মাহমুদ হাসান এবং তিনটি গাড়ি ব্যবহার করে আসছিলেন। ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা দামের ২৭০০ সিসির গাড়ি পেয়ে থাকেন গ্রেড ১ ও গ্রেড ২ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। ৩য় গ্রেডের কর্মকর্তা হয়েও মাহমুদ হাসান ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা দামের গাড়িই ব্যবহার করেছেন। এ ছাড়া ৪০০ জনকে অর্থের বিনিময়ে বদলি করেছেন তিনি। অনুমোদিত ১ হাজার ৬৬৫ জনবলের বিপরীতে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন ২ হাজার ৯৩২ জন এবং এ নিয়োগ দেওয়ায় ১৫ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।

মাহমুদ হাসান সব অভিযোগ অস্বীকার করে গতকাল মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তিনি শুনানিতে যাবেন, লিখিত জবাবও দেবেন।

যোগাযোগ করলে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মোহাং শওকত রশীদ চৌধুরী গতকাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযোগ গুরুতর বলেই তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে আমরা শূন্য সহনশীলতা দেখাব এবং তদন্তে যা পাওয়া যাবে, সে অনুযায়ী পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’