প্রিয় রমজান আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। রমজান শুধু একটি মাস নয়, এটি আল্লাহ–তাআলার পক্ষ থেকে বান্দার জন্য বিশেষ এক সুযোগ। কেউ এই মাসকে স্বাগত জানায় পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে, আবার কেউ আসে অসুস্থ শরীর, ক্লান্ত মন আর অপূর্ণ ইচ্ছা নিয়ে।

কিন্তু রমজানের দরজা সবার জন্যই খোলা—সুস্থ ও অসুস্থ, শক্ত ও দুর্বল, প্রস্তুত ও অপ্রস্তুত সবার জন্য। এই লেখা তাঁদের জন্য, যাঁরা চাইছেন কিন্তু পারছেন না, চেষ্টা করছেন কিন্তু পিছিয়ে পড়ছেন। আবার তাঁদের জন্যও, যাঁরা পারছেন—তাঁরা যেন ভুলে না যান যে আল্লাহ–তাআলা বান্দার শুধু আমল নয়, বরং অন্তর দেখেন।

.

আমরা জানি সবার প্রস্তুতি কখনো এক হয় না। কেউ অনেক আগেই পরিকল্পনা গুছিয়ে ফেলেছেন, কেউ আবার হয়তো অসুস্থতা, ব্যস্ততা বা সফরের কারণে পিছিয়ে আছেন। এতে অনেকের মনে আফসোস কাজ করে।

কিন্তু আল্লাহ–তাআলা কাউকে তাঁর বাস্তবতার বাইরে দাঁড় করিয়ে বিচার করেন না। কোরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৮৬)

.

আমরা যাঁর ইবাদত করতে চাই, তিনি আমাদের পরিস্থিতি বোঝেন। কে কতটা পারছে আর কে কতটা চাচ্ছে কিন্তু পারছে না—সবই তাঁর জানা।

তিনি আস-সামি, আল-বাসির ও আল-লাতিফুল খবির। বান্দার অক্ষমতা দয়ালু আল্লাহর কাছে অপরাধ নয়, বরং কখনো কখনো তা রহমতের দরজা খুলে দেয়।

.হতাশা মানে কি ইমান দুর্বল হওয়া.

রমজানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি হলো আন্তরিক নিয়ত। শরীর যতটুকু সায় দেবে, আল্লাহ–তাআলা ততটুকুই গ্রহণ করবেন। কিন্তু বান্দার অন্তরের ইচ্ছা আর চেষ্টাটুকু তিনি কখনো অবহেলা করেন না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯০৭)

.

রমজান মানেই নিখুঁত হয়ে যাওয়া নয়, বরং আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ফিরে আসা। গুনাহের ভার নিয়ে ইবাদতে ঠিকমতো মন বসে না। তওবা অন্তরকে হালকা করে এবং আল্লাহর দিকে ফেরার পথ তৈরি করে।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফল হও।” (সুরা নূর, আয়াত: ৩১)

.

এ রমজানেও অনেকে ভীষণ অসুস্থ। ইবাদত কমে যাওয়ার কষ্ট অনেক সময় শারীরিক কষ্টের চেয়েও বেশি হয়। কিন্তু আল্লাহ এই দুর্বলতাকেও মূল্য দেন। সুস্থ অবস্থায় যে আমল নিয়মিত ছিল, অসুস্থতার কারণে তা করতে না পারলেও তার সওয়াব বন্ধ হয় না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “বান্দা যখন অসুস্থ হয় বা সফরে থাকে, তখন সে সুস্থ ও মুকিম অবস্থায় যে আমল করত, তার জন্য অনুরূপ সওয়াব লেখা হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৯৬)

.

অসুস্থতার সময় দীর্ঘ তিলাওয়াত সম্ভব না হলেও কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা উচিত নয়। কয়েকটি আয়াত মনোযোগ দিয়ে পড়া, শোনা বা অর্থ বোঝা ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহ বলেন, “আর আমি কোরআন নাজিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত…” (সুরা ইসরা, আয়াত: ৮২)

.ছয়টি রোজায় পূর্ণ হবে এক বছরের রোজা.

তাহাজ্জুদ অনেকেরই অন্তরের ইচ্ছা, কিন্তু শরীর সায় দেয় না। গভীর রাতে উঠতে না পারার কষ্টটা আল্লাহ জানেন। বান্দা যদি মন থেকে চায় কিন্তু অসুস্থতার কারণে না পারে, তবে সেই ইচ্ছার কারণেই তিনি সওয়াব পেতে পারেন।

হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি রাতে সালাত (তাহাজ্জুদ) আদায়ের নিয়ত করে ঘুমাতে যায়, কিন্তু ঘুমের কারণে উঠতে না পারে, তবে তার জন্য নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব লেখা হয়।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ১৭৮৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৩৪৪)

.

অসুস্থতা বা ক্লান্তির মাঝেও ইস্তিগফার ও জিকির করা যায়। জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত হয়েও রাসুলুল্লাহ (সা.) দিনে ৭০ বারের বেশি ইস্তিগফার করতেন। তিনি বলেছেন, “আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে ৭০ বারেরও বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৭)

আল্লাহ–তাআলা বলেন, “জেনে রেখো, আল্লাহর জিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি পায়।” (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)

.

রমজান দোয়া কবুলের মাস। আল্লাহ শব্দের সৌন্দর্য দেখেন না, তিনি অন্তরের আর্তনাদ শোনেন। আল্লাহ বলেন, “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” (সুরা গাফির, আয়াত: ৬০)

.

রমজানে শুধু আমল বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, পাপ থেকে বাঁচারও চেষ্টা করতে হবে। মিথ্যা, গিবত ও হিংসা থেকে নিজেকে রক্ষা করাই রমজানের অন্যতম বড় সফলতা।

.

রমজান শুধু রোজা রাখার মাস নয়; এটি ভেঙে যাওয়া হৃদয় জোড়া লাগানোর মাস। এই মাসে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের এত কাছে টানেন যে একটু চোখের পানি আর অনুশোচনাও অমূল্য হয়ে যায়। তাই অসুস্থ বা ক্লান্ত মানুষদের জন্য রমজান কোনো ভারী বোঝা নয়।

আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা আর আন্তরিক চেষ্টায় করা ছোট ছোট ইবাদতের মাধ্যমেই রমজান আপনার জীবনকে রহমতে পরিপূর্ণ করে তুলতে পারে।

[email protected] 

ইসমত আরা: শিক্ষক ও লেখক

.‘পথের অতিথি’: ইয়েমেনিদের অনন্য ইফতার সংস্কৃতি