দেহটা আসলে কার
তৌফিকুর রহমানের ‘রেখা–গড়ন–স্থিতি’ প্রদর্শনীতে ভাস্কর্য ও অঙ্কন পাশাপাশি দেখলে প্রথমেই যা চোখে পড়ে, তা হলো—এখানে দেহ কোনো স্থির, সম্পূর্ণ ও পূর্বনির্ধারিত অবয়ব নয়। দেহ নির্মীয়মাণ; কখনো সংযোজিত, কখনো খণ্ডিত, কখনো রূপান্তরিত।
তৌফিকুর রহমানের ‘রেখা–গড়ন–স্থিতি’ প্রদর্শনীতে ভাস্কর্য ও অঙ্কন পাশাপাশি দেখলে প্রথমেই যা চোখে পড়ে, তা হলো—এখানে দেহ কোনো স্থির, সম্পূর্ণ ও পূর্বনির্ধারিত অবয়ব নয়। দেহ নির্মীয়মাণ; কখনো সংযোজিত, কখনো খণ্ডিত, কখনো রূপান্তরিত।
এ প্রদর্শনীর সবচেয়ে অভিনব দিকটি হলো শিল্পী মো. আনিসুল হকের নিরীক্ষাধর্মী কাজগুলো। সিরামিকের মসৃণ ও চাকচিক্যময় রূপ থেকে বেরিয়ে আনিসুল হক তাঁর কাজে টেক্সচার বা বুনট যুক্ত করেছেন।
নিতুনদা শিল্পী হিসেবেই আমৃত্যু থাকতে চেয়েছিলেন। সে জন্য নিজের পছন্দের নতুন ইজেল করেছেন, ছাপযন্ত্র (প্রেস) বসিয়েছেন, ছবি করতে কম্পিউটারের ব্যবহার শিখেছেন—এসব নিয়েই কাজ করছিলেন। শিল্পী নিতুন কুন্ডুর সে ইচ্ছা আর পূরণ হলো না।
শিল্পকর্মের ব্যাখ্যা যতই দুরূহ ও বিস্তৃত হোক না কেন, তার প্রথম এবং মৌলিক ভাষাটি শেষ পর্যন্ত তার দৃশ্যমানতাতেই নিহিত।
আমাদের দেশে সামাজিকভাবে স্থপতিদের চিরকালই অবহেলার চোখে দেখা হয়, সে একালই কি আর ওকালই কি। আমি কিছু মনে করি না।
আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের গ্যালারি–৫-এ প্রদর্শিত হলো শিল্পী পলাশ ভট্টাচার্য্যের একক প্রদর্শনী ‘ভূমিবচন’। একটি সংস্কৃতি কীভাবে তার স্মৃতি বহন করে, হারায় এবং নতুনভাবে নির্মাণ করে—তারই এক সংবেদনশীল ও বৌদ্ধিক শিল্পভাষ্য এই প্রদর্শনী।
গত জুনে ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে জাকিয়া খান চন্দনার তৃতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনীর পর বেশ দ্রুতই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে ২ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে তাঁর চতুর্থ একক চিত্রপ্রদর্শনী।
বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের আয়োজনে শিল্পী মাহবুবুর রহমানের পরিচালনা ও কিউরেটিংয়ে ‘বিয়ন্ড দ্য ব্রিফ’ বা ‘নির্দেশনার বাইরে’ নামে ১০ জন শিল্পীর যৌথ প্রদর্শনী চলছে বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান প্রদর্শনালয়ে। প্রদর্শনীর সময়সূচি ও অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের তথ্য দেওয়া হয়েছে।
সোমা সুরভী জান্নাতের শিল্পযাত্রার একটি স্থানাঙ্ক হচ্ছে যুক্তরাজ্যের প্রাচীনতম পাবলিক জাদুঘর অ্যাশমোলিয়ান মিউজিয়াম। অক্সফোর্ডের এই শিল্প ও প্রত্ন জাদুঘরে এখন চলছে সুরভীর একক প্রদর্শনী।
গ্যালারি শিল্পাঙ্গনের আয়োজনে লালমাটিয়ার দ্য ইল্যুশন গ্যালারিতে চলছে ‘জি–৭ (গ্রুপ সেভেন)’ শীর্ষক দলীয় জলরং প্রদর্শনী। এতে অংশগ্রহণ করেছেন সাতজন শিল্পী।
লালমাটিয়ার ভূমি গ্যালারিতে ১০ জুলাই থেকে দুই সপ্তাহব্যাপী ‘রেইনস্কেপ’ শিরোনামের চিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছে; এতে ৭৫টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। প্রদর্শনী চলবে ২২ জুলাই পর্যন্ত।
রেমব্রান্ট। পুরো নাম রেমব্রান্ট হারমেনসজোন ফান রেইন। তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘নাইট ওয়াচের’ গায়ে একটি শিল্ড আছে, সেখানে আঠারোটা নাম খোদাই করা। এই আঠারোজন আমস্টারডামের নাগরিক মিলিশিয়ার সদস্য ছিলেন। ব্যবসায়ী, দোকানদার, পেশাজীবী, যাঁরা শহরের নিরাপত্তায় স্বেচ্ছায় অংশ নিতেন।
প্রচলিত ধারণার বিপরীতে রং, রেখা ও টেক্সচারের স্বতঃস্ফূর্ত বিন্যাসের মাধ্যমে প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী শামছুল আলম আজাদ। গ্যালারি চিত্রকে তাঁর একক প্রদর্শনী ‘দৃশ্যমান কাঠামো’তে প্রদর্শিত হয়েছে তাঁর বিশেষ তিনটি সিরিজ।
শিল্পের ইতিহাসে শরীর কেবল জৈবিক উপস্থিতি নয়, বরং স্মৃতির ধারক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র। বুবলী বর্ণার সাম্প্রতিক শিল্পচর্চায় মাতৃত্বের মাধ্যমে শরীরের পরিবর্তন, পরিচয়ের রূপান্তর এবং অদৃশ্য শ্রমের প্রশ্নগুলো উঠে এসেছে।
শিল্পী জাকিয়া খান চন্দনার তৃতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘অবচেতন মনের বাস্তবতা’ সমসাময়িক বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। ৩ জুলাই শুক্রবার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী শিল্পীর দীর্ঘদিনের সুররিয়ালিস্ট অন্বেষণের একটি পরিণত রূপ। চন্দনার চিত্রকর্মে অবচেতন মন কেবল একটি মনস্তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং একটি দৃশ্যমান পরাবাস্তববাদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তার ক্যানভাসে ভেসে ওঠে স্বপ্ন, স্মৃতি, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপরিচয়ের জটিল স্তর, যা বাস্তব ও কল্পনার সীমারেখাকে ভেঙে দেয়। এই প্রবণতা স্বভাবতই আমাদের মনে করিয়ে দেয় বিশ্বখ্যাত সুররিয়ালিস্ট শিল্পী সালভাদর দালির কথা, যিনি অবচেতন মনের চিত্রায়ণকে শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছিলেন।
সেই অর্থে এই প্রদর্শনীকে বলা যায় জাগতিক ও মহাজাগতিকের মধ্যে এক সৃজনশীল সেতুবন্ধের শিল্পভাষা। রাজধানীর সফিউদ্দিন শিল্পালয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনী শিল্পগুরু সফিউদ্দিন আহমেদের ১০৪তম জন্মবার্ষিকীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। তবে এই শ্রদ্ধা নিছক আনুষ্ঠানিক নয়; বরং একজন শিল্পীর আত্ম–অনুসন্ধানী যাত্রার মধ্য দিয়ে আরেক শিল্পগুরুকে স্মরণ। গত ২৬ জুন শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি ৫ জুলাই পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে।
বাংলাদেশের সমসাময়িক শিল্পচর্চায় আজ একদিকে রয়েছে বাস্তবানুগ বা ফটোগ্রাফিক দক্ষতার প্রতি প্রবল আকর্ষণ, অন্যদিকে রয়েছে প্রকৃতি ও বাস্তবতাকে আত্মস্থ করে সেটিকে নতুন নন্দনভাষায় রূপ দেওয়ার প্রবণতা। রাজধানীর গ্যালারি কায়ার ২২তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ দলগত প্রদর্শনীটি দ্বিতীয় প্রবণতার এক বিস্তৃত ও তাৎপর্যপূর্ণ মানচিত্র হাজির করেছে। প্রদর্শনীতে ৪৫ জন আধুনিক ও সমসাময়িক শিল্পীর ৭৩টি নির্বাচিত শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। ১৯৫৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় সাত দশকের শিল্পযাত্রাকে একত্র করেছে এই আয়োজন।
‘ভূমি গ্যালারি’র উদ্বোধনী প্রদর্শনীর সাফল্যের পর, এবার তিন প্রজন্মের ১০ শিল্পীর সমসাময়িক কালে আঁকা চিত্রকর্ম নিয়ে ‘পারসিসটেন্স’ অর্থাৎ ‘সংকল্প’ নামে বিশেষ একটি চিত্রকর্ম প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ১৯ জুন শুক্রবার। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আগে ও পরের অর্থাৎ গত শতকের সত্তর ও আশির দশকের আটজন স্বনামধন্য চিত্রশিল্পীর সঙ্গে এ শতকের শূন্য ও ১০ দশকের অপেক্ষাকৃত তরুণ দুজন শিল্পীও এ প্রদর্শনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এই দুই শিল্পী সহিদ কাজী ও আবদুল্লাহ আল বশীর।
অনিন্দিতা অনির এই প্রদর্শনী তাই কেবল নারীর গল্প নয়; এটি স্মৃতি, সময়, শরীর, সম্পর্ক ও অস্তিত্বের এক দীর্ঘ যাত্রার দৃশ্যরূপ। পাথরের নীরবতার ভেতর তিনি শুনিয়েছেন নারীর বহু উচ্চারিত ও অনুচ্চারিত কাহিনি। আর সেই কাহিনি পড়তে পড়তে দর্শকের মনে হয়—এ যেন রংতুলিতে লেখা এক উপন্যাস, যার প্রতিটি অধ্যায় একটি পাথর, আর প্রতিটি পাথরের ভেতর লুকিয়ে আছে এক একটি জীবন।
৪৬টি কাজের ভেতরে মানুষের সুখ, স্বপ্ন, দুঃখবোধ ও ইতিহাস-ঐতিহ্য যেমন আছে তেমন আছে বিহ্বলতা এবং আশাহত বিমূঢ়তার প্রতিক্রিয়া। চার প্রজন্মের শিল্পীরা গুরু–শিষ্যের বন্ধনে আবদ্ধ হলেও অপেক্ষাকৃত নবীনরা এযাবৎকালের শিল্পধারা থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত রেখেছেন এ প্রদর্শনীতে।
ফিলিস্তিনের ধ্বংসস্তূপের ভেতর আর্ট বা শিল্প বেঁচে থাকারই একটি ভাষা, একটি অভিব্যক্তি। মারাহ খালেদ আল-জাআনিন সেই ভাষারই একজন একান্ত নিবিড় শিল্পী।
৪৯ নারী শিল্পীর শিল্পকর্ম নিয়ে ‘উইমেন ইন আর্ট ২০২৬’ শিরোনামে অবিন্তা গ্যালারি অব ফাইন আর্টস এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে।
সন্ধ্যায় ট্রাফিক জট খুলতে খুলতে পৌঁছে যাই প্রদর্শনীর গ্যালারিতে। প্রবেশ করতেই শান্তির ছোঁয়া, যেন এক দৃশ্য বা অদৃশ্যের জাদুঘরে এসে পড়লাম; যেখানে সময় তাঁর নতুন বাক্স থেকে একঝাঁক ছাপা ছবি মেলে ধরেছে...
লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্র গ্যালারিতে শিল্পী সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, মনিরুল ইসলাম ও রফিকুন নবীর ছাপচিত্র একই ছাদের নিচে এসেছে। এটা একটা প্রদর্শনী, কিন্তু ভাবতে গেলে এর চেয়ে বেশি কিছু।