শহীদ কাদরীকে চেনার সূত্র কী
আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে শহীদ কাদরীর অবস্থান ও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর কবিপ্রতিভার বিকাশ নিয়ে আলোচনায় উঠে আসে নানা পর্যবেক্ষণ।
আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে শহীদ কাদরীর অবস্থান ও সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর কবিপ্রতিভার বিকাশ নিয়ে আলোচনায় উঠে আসে নানা পর্যবেক্ষণ।
রাজনীতির ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ সর্বগ্রাসী ছিল না। তথাকথিত রাজনীতিশাস্ত্র তাঁকে সমূলে টেনেছে, তা বলার অবকাশ নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও অবিভক্ত ভারতবর্ষের রাজনীতির ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ মূল চরিত্রদের মধ্যে একজন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একমাত্র পরিচালিত চলচ্চিত্র নটীর পূজা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু জীবনের শেষ পর্বে কেন তিনি চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকলেন, সেই প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। তাঁর প্রবন্ধ, চিঠিপত্র এবং শেষ জীবনের শিল্পচর্চার আলোকে এই নিবন্ধে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে।
মেরিলিন মনরোকে মনে পড়লেই ভেসে ওঠে হাওয়ায় উড়তে থাকা এক উর্বশীর স্কার্টের ছবি। আজ ৪ আগস্ট, ৬৪তম মৃত্যুদিনে নামী এই নায়িকার ভেতরের কবিসত্তা খুঁজে দেখা যাক।
তিনটি প্রশ্ন দিয়ে মূল আলোচনায় প্রবেশ করতে চাই। প্রথম প্রশ্ন: ফকির লালন সাঁই নিজে গান পরিবেশন করতেন কি না? দ্বিতীয় প্রশ্ন: লালন সাঁইয়ের গানের কোনো পাণ্ডুলিপি আছে কি না? তৃতীয় প্রশ্ন: লালন সাঁইয়ের সব গানের সুর অডিও বা ভিজ্যুয়ালি সংরক্ষিত আছে কি না?
জুলাই আন্দোলনের প্রাক্কাল থেকে ঢাকার রাজপথের অভিজ্ঞতা, সমন্বয়কদের সাক্ষাৎকার সংগ্রহের উদ্যোগ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়- মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ভূমিকা—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে লিখেছেন লেখক।
ভয় ও ঘৃণার বিপরীতে সংস্কৃতি ও গান কীভাবে প্রতিবাদের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে, তা নিয়ে একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন।
এই প্রবন্ধে গালিগালাজকে নৈতিক বিচ্যুতি হিসেবে নয়; বরং ভাষা, ক্ষমতা ও সংস্কৃতির আন্তসম্পর্কের একটি জটিল সাংস্কৃতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মিশেল ফুকোর জ্ঞান-ক্ষমতা তত্ত্ব আমাদের দেখায় কীভাবে রাষ্ট্র, ধর্ম ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান ভাষার বৈধতা নিয়ন্ত্রণ করে এবং ‘অশ্লীলতা’ নির্মাণ করে।
বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চায় মধ্যবিত্তের ভূমিকা, তাদের আগ্রহের সীমাবদ্ধতা, বৃত্তাবদ্ধতা ও ভাষা-আঙ্গিক প্রসঙ্গ তুলে ধরে একটি মূল্যায়নমূলক বিশ্লেষণ প্রকাশিত হলো মুক্তকণ্ঠে।
নদীর জলে একটি কয়েন পড়ে। তারপর আরেকটি। তারপর আরও একটি। একটি পথশিশু জাহাজের প্রত্যেক মানুষের নামে মঙ্গল কামনা করে একে একে সেগুলো নদীতে নিক্ষেপ করছে। ‘মাস্তুল’ চলচ্চিত্রের এই দৃশ্য যতটা আবেগময়, তার চেয়েও বড় একটি প্রশ্ন রেখে যায়। মানুষ কেন হাজার বছর ধরে নদী, হ্রদ কিংবা ঝরনার জলে মূল্যবান কিছু নিক্ষেপ করে এসেছে?
২০২৬ সাল গোয়েন্দা গল্প ও রহস্য–কাহিনি রচয়িতা রোমেনা আফাজের জন্মশতবর্ষ। তিনি জনপ্রিয় ধারার লেখক ছিলেন, ছিলেন একজন নারী এবং জীবন অতিবাহিত করেছেন মহানগর থেকে দূরবর্তী ‘মফস্সল’ শহর বগুড়ায়।
স্বাধীন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার রূপকল্প ও দৃষ্টিভঙ্গিটি বোঝা যায় ভারতের গণপরিষদে প্রদত্ত সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের এই কথায়: ‘ভারত রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের সঙ্গে নিজেকে চিহ্নিত করবে না বা কোনো ধর্ম দ্বারা পরিচালিত হবে না। আমরা বিশ্বাস করি, কোনো ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা বা অনন্য স্বীকৃতি দেওয়া উচিত নয় এবং কোনো ধর্মকে জাতীয় জীবনে বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়াও অনুচিত, কারণ তা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিমালার লঙ্ঘন এবং ধর্ম ও সরকারের সর্বোত্তম স্বার্থের পরিপন্থী।’
ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জির অংশ নয়; বরং মানবসভ্যতার নৈতিক বিবেকের উজ্জ্বল প্রতীক। নেলসন ম্যান্ডেলা সেই বিরল মানুষদের অন্যতম। তিনি ছিলেন স্বাধীনতার সংগ্রামী, গণতন্ত্রের নির্মাতা, ক্ষমাশীলতার দার্শনিক এবং মানবমর্যাদার এক অনন্য প্রবক্তা।
‘একটি চলচ্চিত্রে গল্প থাকতেই হবে।’ এই কথা আমরা এতবার শুনেছি যে অনেকেই একে চলচ্চিত্রের মৌলিক শর্ত বলে ধরে নিয়েছেন। আমার কাছে বরং এটি অপরিণত দর্শক-মানসের একটি বালখিল্য আকাঙ্ক্ষা। কারণ, গল্প চলচ্চিত্রের একটি উপাদান হতে পারে, পরিচয় নয়।
কবি আতুকেই ওকাই ঘানার আক্রায় জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪১ সালের ১৫ মার্চ। ২০১৮ সালের ১৩ জুলাই তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর আফ্রিকা এবং আফ্রিকার বাইরের নানা দেশে তাঁর কবিতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয় এবং তাঁর কবিতার শক্তিমত্তাকে তুলে ধরা হয়। আফ্রিকান মৌখিক কবিতা (ওরাল পোয়েট্রি) ও পারফরম্যান্স পোয়েট্রির বিকাশে তাঁর অবদান অতুলনীয়।
স্প্যানিশ ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি পাবলো নেরুদা। লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে পঠিত কবির নামও পাবলো নেরুদা। রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, বিপ্লবী, প্রেমিক, নোবেলজয়ী—এমন অসংখ্য অভিধা তাঁর নামের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়।
প্রায় সোয়া শ বছর আগে অত্যন্ত অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে জন্ম নেওয়া কবি পাবলো নেরুদা রেখে গেছেন এমন এক সাহিত্যিক উত্তরাধিকার, যা আজও অমলিন।
পোস্ট-ট্রুথের বিপরীতে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে ‘সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি’—কুন্দেরা যাকে বলছেন ‘প্রশ্নপ্রবণ চেতনা’ বা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিভঙ্গি। অনেকে মনে করেন ‘সেন্সরশিপ’ সমাধান। কিন্তু সেন্সরশিপের নীতিমালা তৈরি করবে বা বাস্তবায়ন করবে যে পক্ষ তাকেও আমরা আর বিশ্বাস করতে পারি না। ফলে ‘সেন্সরশিপ’ আরোপ করে সমালোচনার পথ বন্ধ করার প্রচেষ্টা হিতে বিপরীত হয়ে যায়—সমাজে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তির চর্চার ক্ষেত্র আরও সংকুচিত হয়ে আসে। একটি দেশের গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ যুক্তি দিয়ে মতভেদ করতে শেখে; বিদ্বেষ থেকে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। এই সত্য-উত্তর বাস্তবতায় আমাদের রক্ষাকবচ হতে পারে দেশের সহিষ্ণু, চিন্তাশীল নাগরিক।
দীর্ঘদিন তাঁকে চেনানো হয়েছে দিয়েগো রিভেরার স্ত্রী হিসেবে। এখন সেটা উলটে গেছে। রিভেরা এখন পরিচিত হন ‘ফ্রিদা কাহলোর স্বামী’ হিসেবে। মেক্সিকোর দুই বড় চিত্রশিল্পীর মধ্যে খ্যাতির এই স্থানান্তর যতটা শৈল্পিক প্রশ্ন, ততটাই ক্ষমতার প্রশ্ন।
এখন এ ঘটনার রাজনৈতিক কাঠামোটিকে আরও স্পষ্টভাবে দেখা দরকার। সক্রেটিসের মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল। এ প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া যায় ‘দোষারোপের রাজনীতি’ বা পলিটিকস অব স্কেপগোটিং (বলির পাঁঠা বানানোর রাজনীতি)। প্রতিটি শাসন পরিবর্তনের পর একটি নতুন শাসন তার বৈধতা প্রমাণ করতে চায় পুরোনো শাসনের সঙ্গে যুক্ত কাউকে শাস্তি দিয়ে। কিন্তু যখন আইনি জটিলতায় প্রত্যক্ষ অপরাধীদের ধরা যায় না, তখন দরকার হয় প্রতীকী শিকারের। সক্রেটিস সেই প্রতীক হয়েছিলেন কয়েকটি কারণে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের এমন এক নাম, যিনি কেবল কাব্য ও নাটকের ধারাই বদলে দেননি; বরং সাহিত্যকে একটি নতুন বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর জন্মের দুই শতকের বেশি সময় পেরিয়ে এবং মৃত্যুর দেড় শতাব্দীর কাছাকাছি এসে আজও তাঁর জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা নতুন মাত্রা অর্জন করে, কারণ তিনি একই সঙ্গে ঐতিহ্য ভাঙার সাহস এবং নতুন ঐতিহ্য নির্মাণের শক্তি—দুটিই ধারণ করেছিলেন।
এভাবে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গড়ে ওঠে পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক চৈতন্যের বনিয়াদে। দেশ-কালের বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সে আয় করে নেয় তেজোদ্দীপ্ত উচ্চারণভঙ্গি। তৎসম শব্দ, স্বর ও ব্যঞ্জনের সুরেলা বিন্যাস আর সামষ্টিক জনতার কোরাসসম উচ্চারণে নিষ্পন্ন হয় তার নান্দনিক বিশিষ্টতা। উত্থিত জনতার লিপ্ত আবেশে গড়া যুগের সবল অভিব্যক্তি থেকে সে শুষে নেয় মুক্তির প্রকল্প। যুগসত্য থেকে ছেনে নেওয়া বলেই মুক্তির এ বার্তা এত তীব্র, কার্যকর আর সামঞ্জস্যপূর্ণ। শতবর্ষে এসে নিশ্চিন্তে বলা যায়, বাংলাভাষীরা আরও বহুকাল ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ নিত্য বর্তমান শিল্পকর্ম হিসেবে ব্যবহার ও ভোগ করতে থাকবে।
নজরুলের সাম্যচিন্তা সব যুগের জন্যই প্রাসঙ্গিক। কারণ, এ চিন্তা মৌলিক সর্বজনীন কিছু মানবিক চিন্তার ওপরে স্থিত। আমি মনে করি, নজরুলের সাম্যচিন্তার ওপরে আরও আলাপ-আলোচনা, আরও গবেষণা হওয়া দরকার, যাতে আগামী পৃথিবীর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটেও নজরুল প্রাসঙ্গিক থাকেন।
বিশ শতকের দর্শনের ইতিহাসে ফরাসি দার্শনিক জিল দল্যুজ (১৮ জানুয়ারি ১৯২৫—৪ নভেম্বর ১৯৯৫) এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী নাম। তিনি এমন এক দার্শনিক, যিনি শুধু নতুন কিছু ধারণা প্রস্তাব করেননি, বরং চিন্তা করার প্রচলিত পদ্ধতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। পাশ্চাত্য দর্শনের দীর্ঘ ইতিহাসে পরিচয়, সত্য, সত্তা, যুক্তি, চেতনা কিংবা মানুষের প্রকৃতি নিয়ে যে ধরনের আলোচনা প্রচলিত ছিল, দল্যুজ সেই আলোচনার কেন্দ্রে একটি মৌলিক পরিবর্তন আনেন। তাঁর কাছে দর্শনের কাজ কোনো চূড়ান্ত সত্য আবিষ্কার করা নয়, বরং নতুন ধারণা সৃষ্টি করা।