নানা দেশের সাহিত্যে রমজানের জীবন–ক্যানভাস
ইরানি সাহিত্যে রোজাকে তুলনা করা হয়েছে এমন এক প্রদীপের সঙ্গে, যা নফসের অন্ধকার দূর করে এবং এমন এক নদীর সঙ্গে, যা আত্মার সব কলুষতা ধুয়ে দেয়।
ইরানি সাহিত্যে রোজাকে তুলনা করা হয়েছে এমন এক প্রদীপের সঙ্গে, যা নফসের অন্ধকার দূর করে এবং এমন এক নদীর সঙ্গে, যা আত্মার সব কলুষতা ধুয়ে দেয়।
সৌদি আরবে ইফতার শুরু হয় সাদামাটাভাবে, যাকে স্থানীয়রা বলেন ‘ফকুক আল-রিক’ বা রোজা ভাঙার মুহূর্ত। এক গ্লাস পানি, মদিনার আজওয়া খেজুর আর এক কাপ ‘গাহওয়া’।
যে রোজা রাখে, অন্য কারও তা জানার সুযোগ নেই। কেউ যদি সাহ্রি ও ইফতার করে মাঝখানে গোপনে কিছু খেয়ে ফেলে, তবে মানুষ তা বুঝতে পারবে না।
ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলের প্রাচীন রীতি—লবণ দিয়ে ইফতার করা। তারা বিশ্বাস করেন, দীর্ঘ উপবাসের পর লবণ মুখে দিয়ে রোজা ভাঙা শরীরের জন্য উপকারী।
কামানের গোলা ছোঁড়ার পর যখন শহরের শত শত মসজিদের মিনারে সাদা বাতি জ্বলে ওঠে, তখন সারায়েভোকে মনে হয় পাহাড়ের কোলে জমানো একরাশ জোনাকি।
প্রত্যেকের দস্তরখানে নিজের তৈরি খাবারের চেয়ে প্রতিবেশীদের থেকে আসা খাবারের পরিমাণই বেশি থাকে। এটি সিরীয় সমাজের সংহতি ও সহমর্মিতার এক অনন্য উদাহরণ।
ইফতারে তারা পরিবারের সদস্য সংখ্যার চেয়ে অন্তত একটি প্লেট বেশি সাজিয়ে রাখে, যদি ইফতারের মুহূর্তে কোনো মুসাফির বা মেহমান দরজায় কড়া নাড়েন!
ক্যাম্পেইনের মূল স্লোগান হলো—‘একটি খেজুরের জন্য একটি জীবন হারাবেন না’। কেননা, ইফতারের পূর্বে জর্ডানিরা প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেন।
কুয়ালালামপুরের কাম্পুং বারু মসজিদে প্রতিদিন বড় বড় ডেকচিতে খিচুড়ি রান্না করা হয়। আসরের পর থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ ‘বুবুর লাম্বুক’ সংগ্রহ করেন।
১৭৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের তিনটি প্রাচীন মাটির ফলক স্ক্রিপ্টকে বলা হয় বিশ্বের প্রথম রান্নার বই। সেই প্রাচীন ‘খুবজ আল-আরুক’ আজও ইরাকি ইফতারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এ–বছর রমজান উপলক্ষে জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে আফ্রিকার অন্যতম বড় প্রদর্শনী ‘ঈদ ফিস্ট’। এখানে তুরস্কের পোশাক থেকে শুরু করে ভারতীয় মশলা—সবই পাওয়া যায়।
ফিলিস্তিনের ইফতার টেবিলের মধ্যমণি হলো ‘মাকলুবা’। মাংস, ভাত আর ভাজা সবজি দিয়ে রান্না করা খাবারটি পরিবেশনের সময় পাত্রটি উল্টে দেওয়া হয়। ‘মাকলুবা’ মানে উল্টানো।
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ায় রমজান রাতে এক বিচিত্র খেলা জমে ওঠে, যার নাম ‘আন্ডা যুদ্ধ’। সাহ্রি পর্যন্ত মানুষকে জাগিয়ে রাখতে এই শতাব্দী প্রাচীন খেলার আয়োজন করা হয়।
এ–বছর রমজানে নিউইয়র্কের বিখ্যাত টাইম স্কয়ার এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে। হাজারো মুসলিম ডিজিটাল বিলবোর্ডের আলোর নিচে দাঁড়িয়ে জামাতে তারাবি পড়েছেন।
এ–বছর কম্বোডিয়া সরকার ‘কম্বোডিয়া রমজান বাজার'-কে বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরেছে। মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো এখানেও এখন বিশাল ইফতার বাজার বসে।
যেখানে বছরের বেশিরভাগ সময় সূর্য লুকোচুরি খেলে এবং তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে থাকে, সেখানে রমজান পালন করা যেন এক রোমাঞ্চকর আধ্যাত্মিক যুদ্ধ।
রমজানের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে বাহরাইন মেতে ওঠে কুরকাউন উৎসবে। শিশুরা ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাক পরে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় এবং লোকসংগীত গায়।
তবুও সুদানিরা তাদের আতিথেয়তা ছাড়েনি। বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোও তাবুর সামনে ছোট করে পাটি বিছিয়ে ইফতার ভাগ করে নিচ্ছেন, যেন তা তাদের টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
অনেক ক্ষেত্রে পণ্য বিক্রি করা হলেও তার দাম রাখা হয় আকাশচুম্বী। চাল, ডাল বা তেলের মতো সাধারণ খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করতেও তাদের গোপনে বা অন্যের সাহায্য নিয়ে বাজারে যেতে হয়।
শত বছরের পুরোনো প্রথা মেনে পাহাড়ের চূড়ায় আগুন জ্বালিয়ে ইফতারের সময় ঘোষণা করা হয়। আগুনের শিখা দেখে গ্রামের মানুষ বুঝতে পারে রোজা ভাঙার সময় হয়েছে।
কোরআন রমজানে এখানকার প্রতিটি মসজিদ মুখরিত থাকে কোরআন তিলাওয়াতে। বিশেষ করে শিশুদের উৎসাহিত করার জন্য পাড়ায় পাড়ায় হাফেজদের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ায় রমজান মানে জাতীয় উৎসবের মাস। ১৮ হাজার দ্বীপের এই বিশাল দ্বীপপুঞ্জে রমজান আসে সংস্কৃতির বিচিত্র রঙ মেখে।
যেখানে বিশ্বের অনেক দেশে রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে, সেখানে আফগান সরকার এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা ভেবে দাম কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
জার্মানির শহরগুলোতে এখন আর ইফতার কেবল ঘরের চার দেয়ালে বা মসজিদের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই; তা ছড়িয়ে পড়েছে রাজপথে, এমনকি চার্চের আঙিনাতেও।