মরদেহ সৎকারের জন্য শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে বাড়িতে। আর সেই প্রস্তুতির মাঝেই ঘরে চুপচাপ বসে অঝোরে কাঁদছেন অর্জুন বণিক। তাঁর ২৬ বছর বয়সী সন্তান অরূপ বণিকের কথা জিজ্ঞেস করতেই হু হু করে কেঁদে ওঠেন তিনি। অরূপকে এভাবে অকালে হারাতে হবে, তা কখনো স্বপ্নেও ভাবেননি এই শোকাতুর বাবা।

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের হাদিফকিরহাট এলাকার বাসিন্দা অর্জুন বণিক। তাঁর ছেলে অরূপ বণিক এক সপ্তাহ ধরে জ্বরে ভুগছিলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের দাবি, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েই অরূপের এই মৃত্যু। অসুস্থ শরীর নিয়েই গতকাল বিকেলে ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরেন তিনি। তবে বাড়ি ফেরার মাত্র এক ঘণ্টা পর তাঁর মৃত্যু হয়। রাত ১১টার দিকে পারিবারিক শ্মশানে অরূপের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছে।

বইয়ের প্রতি অরূপের ছিল গভীর অনুরাগ। শুধু নিজে বই পড়তেনই না, অন্যদের মাঝেও বই ছড়িয়ে দিতে ভালোবাসতেন তিনি। বইয়ের প্রতি এই অদম্য ভালোবাসা থেকেই করোনাকালে আরও দুই বন্ধুকে সাথে নিয়ে অনলাইনে বই বিক্রির প্ল্যাটফর্ম ‘বইপাড়া ডটকম’ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে ঢাকার বাংলাবাজারে একটি বইয়ের দোকানও দেন অরূপ। পুরান ঢাকার একটি মেসে থেকে তিনি তাঁর এই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।

অরূপের বাবা অর্জুন বণিক জানান, দুই সপ্তাহ আগে তাঁদের পরিবারের সবাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যদের সেবা-শুশ্রূষা করার জন্য ঢাকা থেকে দ্রুত ছুটে আসেন অরূপ। পরিবারের সদস্যরা কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি পুনরায় ঢাকায় ফিরে যান। কিন্তু ঢাকায় ফেরার পর অরূপ নিজেও জ্বরে আক্রান্ত হন। তাঁর শরীরে ব্যথা এবং ডেঙ্গুর অন্যান্য সব লক্ষণ দেখা দেয়।

কিশোর বয়স থেকেই অরূপ এলাকার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে তিনি সবসময় পছন্দ করতেন। বই পড়ার মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব—এই বিশ্বাস থেকেই তিনি বই ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

স্মৃতিচারণ করে অর্জুন বণিক বলেন, ‘তাকে বারবার ঢাকা থেকে বাড়ি আসার তাগাদা দিয়েছি। কিন্তু ছেলে আমার কথা শোনেনি। আর কুলিয়ে উঠতে না পেরে বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়ি এসেছিল। বাস থেকে নামার পর জড়িয়ে ধরে কোনোমতে ওকে বাড়িতে নিয়ে আসি। ঘরে আসার এক ঘণ্টা মধ্যেই তার অবস্থার আরও অবনতি হয়। আমরা স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই তাকে। সেখানে চিকিৎসক জানায়, আমার ছেলে আর নেই।’ কাঁদতে কাঁদতে তিনি আরও বলেন, ‘এখন মনে হচ্ছে আমাদের শুধু একনজর দেখতেই অরূপ বাড়িতে এসেছিল। আমার এমন সোনার টুকরো ছেলেটিকে ডেঙ্গু কেড়ে নিল, আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব।’

অর্জুন বণিকের দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে অরূপ ছিলেন সবার ছোট। গতকাল রাতে তাঁর বাড়িতে দেখা যায়, অরূপের মরদেহের পাশে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন তাঁর দুই বোন। অরূপের বন্ধুরাও সেখানে ছুটে এসেছিলেন। কেউ হাউমাউ করে কাঁদছিলেন, আবার কেউ স্মৃতিচারণ করছিলেন তাঁর কথা।

বন্ধু ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, অরূপ সরকারহাট এনআর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং মিরসরাইয়ের প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ফেনীর জয়নাল হাজারী কলেজ থেকে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

২০২০ সালে করোনাকালে ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ায় দুই বন্ধু আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ও অনিক বণিককে নিয়ে অনলাইনে বই বিক্রির প্ল্যাটফর্ম ‘বইপাড়া ডটকম’ চালু করেন অরূপ। উদ্যোগটি শুরুর অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলার পাঠকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

দুই বছর পর ফেনী শহর ছেড়ে চট্টগ্রাম নগরে অবস্থান করে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যান অরূপ। এই সময়ে তাঁর দুই বন্ধু বই বিক্রির কাজ থেকে সরে গেলেও অরূপ একাই উদ্যোগটি চালিয়ে যান। অনলাইনে বই বিক্রির পাশাপাশি ২০২৪ সালে ঢাকার বাংলাবাজারে একটি দোকান খোলেন তিনি। পুরান ঢাকার একটি মেসে থেকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের বই বিক্রি করতেন তিনি।

অরূপের বন্ধু ও একই এলাকার বাসিন্দা মো. মোস্তফার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিশোর বয়স থেকেই এলাকায় নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন অরূপ। মানুষের দুঃসময়ে পাশে থাকতে ভালোবাসতেন তিনি। বই পাঠের মাধ্যমে মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন হয়, এমন ভাবনা থেকেই তিনি বই ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে নিজেকে যুক্ত করেন।

অরূপের মৃত্যুর খবর পেয়ে গতকাল রাতে ফেনী শহর থেকে তাঁর বাড়িতে আসেন বন্ধু ও বইপাড়া ডটকমের সহ–উদ্যোক্তা আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। শ্মশানে শেষকৃত্যের আগে তিনি বন্ধুর মরদেহ জড়িয়ে ধরে দীর্ঘক্ষণ কাঁদেন। আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘করোনাকালে তিন বন্ধু মিলে বইপাড়া ডটকম চালু করেছিলাম। অল্প সময়ের মধ্যে উদ্যোগটি সাড়া ফেলেছিল। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি নানা ধরনের বই বিক্রি করতাম তাঁরা। আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যেও অরূপ বই বিক্রির কাজ চালিয়ে গেছে। এটিকেই জীবিকা হিসেবে নিয়েছিল অরূপ। অরূপের এভাবে চলে যাওয়া কিছুতেই মানতে পারছি না।’