গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে নতুন একটি জাতীয় কমিটি গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে জনমত তৈরি ও আন্দোলন জোরদার করতে প্রস্তাবিত এই কমিটিতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি জোটভুক্ত দলগুলোর দ্বিতীয় সারির নেতা ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যদেরও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা বলছেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ও সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে জনমত গঠন, বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় ও মাঠের কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোই হবে এই কমিটির মূল লক্ষ্য।

জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৭ অক্টোবর রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে কমিটি গঠনের বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়। কমিটির সদস্য ও কার্যক্রম নিয়ে একটি খসড়া রূপরেখাও তৈরি হয়েছে।

বিরোধী জোটের একাধিক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতা জানান, ‘সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি’ বা ‘সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ’ নামে এই কাঠামো গঠনের আলোচনা চলছে। কমিটি ১৫ থেকে ২১ সদস্যের হতে পারে। তবে কমিটির নাম, সদস্যসংখ্যা ও কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতাদের পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

তাঁরা জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিরোধী দলের এমপিরা শপথ নিয়েছেন। সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়ে করা অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তাঁদের দায়িত্ব রয়েছে। সে দায়িত্ব পালনের উদ্যোগ হিসেবেই জাতীয় কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যেহেতু সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছি, আমাদের একটা দায়িত্ব আছে। আমরা চুপচাপ বসে থাকতে পারি না। সে জন্য সংস্কার বাস্তবায়ন পরিষদ গঠনের আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।’

১১-দলীয় ঐক্যভুক্ত একটি দলের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা বলেন, এ মুহূর্তে জনগণকে সচেতন করা ছাড়া বিরোধী দলের সে অর্থে অন্য কিছু করার নেই। সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনই এই কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য। সরকারও যেন ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সংস্কার পরিষদ গঠন করে।

প্রস্তাবিত কমিটিতে রাখার বিষয়ে যাঁদের নাম আলোচনায় আছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান (মোমেন), জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আইনজীবী শিশির মনির, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সংসদ সদস্য মুহাম্মদুল্লাহ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি তাসমিয়া প্রধান এবং জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগমের নামও আলোচনায় রয়েছে। রোকেয়া বেগম সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য।

বিরোধী জোটের নেতারা মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সে কারণে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলনেও রাজনৈতিক দলের বাইরের মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে চান তাঁরা। শহীদ পরিবার, জুলাই যোদ্ধা ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁদের।

সূত্র জানায়, জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় সভা, সারা দেশে গণসংযোগ, আইনজীবী, কূটনীতিক, শিক্ষকসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা ও গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করা হতে পারে। মাঠের কর্মসূচিও থাকতে পারে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সরকার যে প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের পথে এগোচ্ছে, তা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নয়। তাঁর মতে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমেই এগোতে হবে। সে দাবি সামনে রেখেই নতুন কমিটির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৯টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে বৈধ ভোটের ৬৮ শতাংশ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে পড়ে। কিন্তু সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ নেননি। অন্যদিকে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা এই শপথ নিয়ে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে অনড় রয়েছেন।

এই মতভিন্নতার মধ্যে গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করে। বিরোধীদলীয় প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি সম্প্রসারণের সুযোগ রাখা হয়। কমিটিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে বিরোধী দল এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সরকার যে প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধনের পথে এগোচ্ছে, তা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নয়। তাঁর মতে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমেই এগোতে হবে। সে দাবি সামনে রেখেই নতুন কমিটির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।