মোগল আমলের ঢাকাকে মসজিদের শহরের পাশাপাশি কামানের শহর বলা হলেও কি খুব বেশি কথা বলা হবে? সেই সময়ে এই ঢাকা শহরে নানা আকার ও বৈচিত্র্যের কামান তৈরি করা হয়েছিল, যার প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে। ঢাকা এবং এর আশপাশের বিভিন্ন স্থানে মাটির নিচে মোগল বা সুলতানি আমলের অনেক কামান এখনো পাওয়া যায়। ঢাকার ইতিহাস অনুরাগী ব্যক্তিরা আজও দুটি বিশেষ কামানের কথা মনে করেন—একটি হলো মীর জুমলার বিবি মরিয়ম কামান, যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে সংরক্ষিত আছে; অন্যটি হলো বুড়িগঙ্গায় তলিয়ে যাওয়া বিশালাকার কালে খাঁ কামান। এই নামের সাথে অনেকেরই পরিচয় থাকতে পারে।
১৭৭৪ সালের ৮ জানুয়ারি ঢাকা থেকে লন্ডনের ড. হকারওয়ার্থের কাছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন কর্মকর্তা মি. জে সি-র স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয়। ওই কর্মকর্তা চিঠিতে তাঁর পূর্ণ নাম উল্লেখ করেননি। তিনি সেই চিঠিতে লিখেছিলেন:
“এই শহরের বিপরীত দিকে আমাদের ফ্যাক্টরি থেকে দক্ষিণ–পশ্চিম দিকে প্রায় ১৫০ গজ দূরে একটি ছোট দ্বীপ (নদীর চর) রয়েছে; সেখানে পড়ে আছে এযাবৎ আমার দেখা সর্ববৃহৎ একটি যুদ্ধাস্ত্র (কামান) ও দুটি পাথরের বল। সেগুলোর আকার দেখে প্রতীয়মান হয়, সেগুলো ওই কামানেরই গোলা। এটি একটি অনন্যসাধারণ নির্মিত বস্তু, যা দীর্ঘকাল ধরে এভাবেই পড়ে রয়েছে। কামানটি এখানে কে এনেছিল বা সেটি কোথা থেকে এখানে আনা হয়েছিল, সে বিষয়ে এখানকার সবচেয়ে বয়স্ক লোকটিও কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এটি নিশ্চয়ই আদি কামান আবিষ্কারের মতোই। প্রাচীন এই কামান প্রথম দর্শনে মনে হবে ঢালাই করে নির্মিত, কিন্তু এর মুখের অংশ ও চেম্বার পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে যে এটি কতগুলো দণ্ড ও লোহার আংটার মাধ্যমে সংযোজিত করে নির্মাণ করা হয়েছে। আমি সতর্কতার সঙ্গে এর পরিমাপ নিয়েছি এবং এর একটি ড্রয়িং প্রস্তুত করে আপনার কাছে পাঠিয়েছি। আপনি যদি এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ও সাধারণের কাছে তুলে ধরবার উপযোগী মনে করেন, তবে আমি আশা করি, তা জেন্টলম্যান ম্যাগাজিনে প্রকাশ করা যেতে পারে। আমার স্মরণ হয় যে লন্ডন টাওয়ারে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে প্রদর্শিত একইভাবে নির্মিত কিছু কামান দেখেছিলাম, কিন্তু সেগুলো এখানে প্রাপ্ত কামানের মতো সুনির্মিত নয়।”
মি. জে সি তাঁর চিঠির শেষ অংশে ঢাকার ধ্বংসপ্রাপ্ত ও বিলীয়মান মোগল স্থাপত্যের সৌন্দর্যের প্রশংসা করেন। তিনি কামানের বিস্তারিত মাপ এবং একটি সেকশনাল ড্রয়িং তৈরি করে লন্ডনের ড. হকারওয়ার্থের কাছে পাঠিয়েছিলেন যাতে তা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। সেই চিঠি, পরিমাপ এবং ড্রয়িং ওই বছরের ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, মি. হকারওয়ার্থ তা দেখার সুযোগ পাননি, কারণ প্রকাশের আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। ধারণা করা হয়, মৃত্যুর আগেই তিনি সেই নথিগুলো জেন্টলম্যান ম্যাগাজিনে প্রকাশের ব্যবস্থা করেছিলেন। মি. জে সির পুরো নাম জানা সম্ভব হয়নি, তবে ম্যাগাজিনে তাঁকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৭৭৪ সালের ঢাকার ইংলিশ ফ্যাক্টরির কর্মকর্তাদের তালিকা খতিয়ে দেখলে হয়তো তাঁর পূর্ণ নাম পাওয়া যেতে পারে।
মি. জে সির চিঠিতে বর্ণিত এই কামানটিই বহুল পরিচিত কালে খাঁ কামান। তবে এই নামের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। লেখক মুনতাসীর মামুন তাঁর একটি লেখায় জানিয়েছেন, এই কামানের নামকরণ কে করেছিলেন তা জানা নেই, তবে লোকমুখে এই নামটি প্রচলিত ছিল। সেই সময়ে ঢাকায় কর্মরত কয়েকজন ব্রিটিশ সিভিলিয়ান কর্মকর্তার লেখায় এই কামানের কথা পাওয়া যায়। যেমন—ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল জেমস রেনেল, কর্মকর্তা রবার্ট লিন্ডসে এবং পরবর্তী সময়ের ঢাকার বিখ্যাত কালেক্টর ও চিত্রশিল্পী চার্লস ডি-অয়লি। যদিও তাঁরা তাঁদের লেখায় ‘কালে খাঁ’ নামটি ব্যবহার করেননি। তবে মি. জে সির পত্রটি অন্যান্য বর্ণনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, কারণ এটিই এই বিষয়ে প্রথম প্রকাশিত দলিল এবং এতেই প্রথম পরিমাপের সাথে ড্রয়িং সংযুক্ত করা হয়েছিল। বিষয়টি তিনি এতটাই গুরুত্ব দিয়েছিলেন যে সাধারণ মানুষকে জানানোর জন্য বিখ্যাত জেন্টলম্যান ম্যাগাজিনে তা প্রকাশের উদ্যোগ নেন।
১৭৮৮ সালে প্রকাশিত জেমস রেনেলের ‘মেমোয়ার অব আ ম্যাপ অব হিন্দুস্তান অর দ্য মুঘল এম্পায়ার’ এবং ১৮৪০ সালে প্রকাশিত রবার্ট লিন্ডসের ‘এনেকডটস অব ইন্ডিয়ান লাইফ’—এই দুটি বইয়ে কালে খাঁ কামানের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তবে ১৭৭৪ সালে মি. জে সির দেওয়া বর্ণনা এবং বিশেষ করে তাঁর ড্রয়িংটি কামানের প্রকৃত অবয়ব বুঝতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে। কোনো বস্তুর পূর্ণ অবয়ব কেবল পরিমাপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা প্রায় অসম্ভব, কারণ ত্রিমাত্রিক ধারণা পাওয়া গেলেও দৃশ্যমান ড্রয়িং ছাড়া সঠিক গঠন নির্মাণ করা যায় না।
রেনেল ও লিন্ডসে কামানটির দৈর্ঘ্য, ওজন ও বিভিন্ন অংশের মাপ দিয়েছেন। লিন্ডসে দাবি করেছেন কামানটির দৈর্ঘ্য ছিল ৩৪ ফুট। কিন্তু রেনেল ও মি. জে সির বর্ণনায় দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ২২ ফুট সাড়ে ১০ ইঞ্চি এবং ২২ ফুট ৬ ইঞ্চি। যেহেতু এই দুইজনের পরিমাপ কাছাকাছি, তাই ধরে নেওয়া যায় কামানটির দৈর্ঘ্য ২২ ফুটের কিছু বেশি ছিল। কালেক্টর চার্লস ডি’ অয়লি তাঁর ‘অ্যান্টিকুইটিজ অব ঢাকা’ বইতে রেনেলের দেওয়া পরিমাপটিই উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত তিন ব্যক্তিকে পাওয়া গেছে যারা সরাসরি কামানটির পরিমাপ সংগ্রহ করেছিলেন।
মি. জে সি ১৭৭৪ সালে ঢাকায় কর্মরত থাকাকালীন এই পরিমাপ নিয়েছিলেন। রেনেল ও লিন্ডসে ঢাকায় আসেন ১৭৭৬ সালে; তাই ধরে নেওয়া যায় তাঁরা সেই বছর বা তার পরে পরিমাপগুলো লিপিবদ্ধ করেন। অর্থাৎ, তথ্যানুসারে মি. জে সি-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি কালে খাঁ কামানের পরিমাপ নেন এবং ছবি আঁকেন। তাঁর দেওয়া বিশদ পরিমাপ ও সতর্কতার বিষয়টি বিবেচনা করে আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর তথ্য গ্রহণ করতে আগ্রহী।
কালে খাঁ কামানটি বুড়িগঙ্গার একটি দ্বীপে পড়ে ছিল এবং দ্বীপটি ভাঙনের ফলে সেটি নদীতে তলিয়ে যায়—এই কথা প্রায় সবাই উল্লেখ করেছেন। রবার্ট লিন্ডসের মাধ্যমে জানা যায়, ১৭৮০ সালে কামানটি তলিয়ে যায়। লিন্ডসের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি এবং তাঁর যান্ত্রিক প্রকৌশল দক্ষ বন্ধু কোরি একটি নৌকা তৈরি করে কামানটি কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার আগেই তাঁদের ঢাকা ছেড়ে চলে যেতে হয়। প্রশাসনের অবহেলায় এমন এক অনন্য প্রত্নসম্পদ হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে লিন্ডসে গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন।
জেমস রেনেলের পরিমাপ ব্যবহার করে আমি আগে কালে খাঁ কামানের একটি সম্ভাব্য ত্রিমাত্রিক অবয়ব তৈরি করেছিলাম, যা ২০০৬ সালে মুক্তকণ্ঠের ঈদসংখ্যায় ‘জলতলের প্রত্নরত্ন’ এবং ২০১৯ সালের ঈদসংখ্যায় ‘ঢাকার কামান’ নিবন্ধে প্রকাশিত হয়। তবে সেটি ছিল কেবল রেনেলের লিখিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আঁকা। এখন মি. জে সির বিস্তারিত পরিমাপ ও সেকশনাল ড্রয়িং অবলম্বন করে আমি পুনরায় অবয়ব তৈরি করেছি এবং আশা করি এটিই হবে কামানটির প্রকৃত রূপ। সেটি এই লেখার সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে থাকা বিবি মরিয়ম কামানের আকার আমাদের অবাক করে। অথচ কালে খাঁ কামানটি বিবি মরিয়ম কামানের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি দীর্ঘ এক অনন্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ, যা এখনো বুড়িগঙ্গার তলদেশে রয়ে গেছে। এই কামানটি কীভাবে উদ্ধার করা সম্ভব, তার সম্ভাব্য প্রক্রিয়া নিয়ে আমি অন্যত্র লিখেছি। নিঃসন্দেহে, কালে খাঁ উদ্ধার হলে তা সেদিনের পত্রলেখক মি. জে সির মতো বর্তমান ঢাকাবাসীর জন্যও হবে এক বিস্ময়কর ও গৌরবময় ইতিহাসের স্মারক।
— শামীম আমিনুর রহমান : গবেষক, সংগ্রাহক ও স্থপতি