পাবনায় বজ্রপাতে প্রাণ হারানো ছয়জনের শোক যেন শেষ হতে না হতেই স্বজনদের মনে বাসা বেঁধেছে এক নতুন আতঙ্ক। প্রিয়জনের কবর থেকে কঙ্কাল চুরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এখন রাত জেগে পাহারা দিতে হচ্ছে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের। প্রতিদিন রাত ১১টা থেকে শুরু করে ভোর ৫টা পর্যন্ত পালাক্রমে এই পাহারার কাজ চলছে।
ভুক্তভোগী স্বজনদের দাবি, কেবল রাত জেগে কবর পাহারা দেওয়াই নয়, এই তীব্র আতঙ্কে তারা নিজেদের বাড়িতেও স্বস্তিতে থাকতে পারছেন না। প্রিয়জনের কবরের নিরাপত্তা নিয়ে তারা প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে তারা প্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন। কবরস্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং একটি স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার অনুরোধ করেছেন তারা, যাতে কবরের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে তাদের মানসিক দুশ্চিন্তা কমে।
গত ৩০ অক্টোবর পাবনা সদর উপজেলার মালঞ্চি ইউনিয়নের সোনাপাতিলা ও ঝপঝপিয়া বিল এলাকায় মাছ ধরার সময় বজ্রপাতে ছয়জনের মৃত্যু ঘটে। নিহতদের পরিচয় পাওয়া গেছে— মালঞ্চি ইউনিয়নের গজমতিকুন্ডা এলাকার রবিউল ইসলামের ছেলে শাওন (২৪), নলমুড়া এলাকার ইসমাইল মোল্লার ছেলে রব্বেল মোল্লা (২০), শাজাহান প্রামাণিকের ছেলে মিজানুর রহমান (১০), নাজিম উদ্দিনের ছেলে সাজিদ (১৪), শাহাদুলের ছেলে আব্দুল্লাহ (১৮) এবং ইবাদুলের ছেলে ইমন (১৪)।
পরদিন বাসুদেবপুর কবরস্থানে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হয়। দাফন প্রক্রিয়ার পর থেকেই কবর থেকে কঙ্কাল চুরির আশঙ্কায় চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন নিহতদের স্বজনরা। সেই উদ্বেগের তাড়না থেকেই তারা প্রতিদিন রাতভর কবরের পাশে অবস্থান করছেন।
নিহত রব্বেল মোল্লার বাবা ইসমাইল মোল্লা অত্যন্ত শোকাহত কণ্ঠে বলেন, “একই পরিবারের চারজনকে হারিয়ে এখন আমরা নিঃস্ব। একদিকে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে রাতভর সন্তানদের কবর পাহারা দিতে হচ্ছে। পরিবারের বড় হওয়ায় দায়িত্বটা আমার ওপর বেশি। সবাইকে আমাকেই বোঝাতে হয়। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, সন্তানদের কবরগুলো যেন একটু বাঁধাই করে দেওয়া হয়।”
এলাকাবাসী মামুন শেখ জানান, “কুসংস্কার হলেও আমরা একটা কথা শুনেছি, বজ্রপাতে মারা যাওয়া মানুষের লাশ কবর থেকে চুরি হয়ে যায়। এ কারণে এলাকাবাসী ও নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা মিলে সারা রাত কবরগুলো পাহারা দিচ্ছি। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, কবরগুলোর নিরাপত্তার জন্য একটা ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক।”
স্থানীয় বাসিন্দা পলাশ হোসেন বলেন, “মাঝেমধ্যে খবর পাই, বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তিদের লাশ কবর থেকে চুরি হয়ে যায়। এখানে একসঙ্গে ছয়টি কবর রয়েছে। তাই আমাদের আতঙ্কও বেশি। কবরগুলো বাঁধাই করে দিলে আমরা কিছুটা দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারতাম।”
এদিকে, কবরস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে স্বজনদের এই উদ্বেগের কথা জানতে পেরে পদক্ষেপ নিয়েছেন পুলিশ। পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ বলেন, “কবরস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে স্বজনদের উদ্বেগের বিষয়টি জানার পর সেখানে পুলিশের বিশেষ টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সদর থানার বিট কর্মকর্তাকে নিয়মিত কবরস্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে না।”