পিৎজায় আনারস দেওয়াকে নিজের সংস্কৃতির প্রতি চরম অপমান হিসেবে গণ্য করেন এক ইতালীয় শেফ। আর এই সাংস্কৃতিক সংঘাতের চূড়ান্ত পর্যায়ে রেস্তোরাঁর একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে আনারস দেওয়া পিৎজা তৈরি করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। এর ফলে অন্যান্য কিছু অভিযোগের সাথে যুক্ত হয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনের একটি রেস্তোরাঁ থেকে চাকরি খুইয়েছেন দাভিদে তাম্বুরেলা নামের ওই শেফ।
তাম্বুরেলা অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনের ‘লা কস্তা’ নামক একটি রেস্তোরাঁয় কর্মরত ছিলেন, যা বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। গত মে মাসে কর্তৃপক্ষ তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়। এই পদক্ষেপের দুই সপ্তাহ আগে তাঁর সাথে একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ তাঁর আচরণ ও পেশাদারিত্ব নিয়ে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করে।
কর্তৃপক্ষের আনা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল রেস্তোরাঁর একটি অনুষ্ঠানে অতিথিদের জন্য হ্যাম ও আনারস দেওয়া পিৎজা তৈরি করতে তাঁর অনীহা। তাম্বুরেলা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, “কর্তৃপক্ষের এমন কোনো নির্দেশ তিনি মানবেন না, যা তাঁর সংস্কৃতির জন্য অপমানজনক।”
তবে তাম্বুরেলা দাবি করেছেন যে, তাঁকে অন্যায়ভাবে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এই অবিচারের প্রতিকার চেয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার শ্রমবিষয়ক ট্রাইব্যুনাল ‘ফেয়ার ওয়ার্ক কমিশন’-এ অভিযোগ দায়ের করেন। এই আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই পুরো ঘটনাটি জনসমক্ষে আসে।
গত মঙ্গলবার কমিশন এক বিবৃতিতে জানায়, তাম্বুরেলা ইতালীয় বংশোদ্ভূত। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, পিৎজায় আনারস ব্যবহার করা তাঁর দেশের সংস্কৃতিকে ছোট করার শামিল। আর এই আদর্শিক কারণেই তিনি পিৎজায় আনারস দিতে চাননি।
কমিশনের তথ্যানুসারে, গত চার বছরে তিনি মোট তিনবার পিৎজায় আনারস দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এমনকি এর আগে তিনি রেস্তোরাঁর মালিককে অনুরোধ করেছিলেন যেন ইতালীয়দের কাছে পিৎজায় আনারস না দেওয়ার বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা যাচাই করে দেখা হয়।
উল্লেখ্য, তাম্বুরেলার কর্মস্থল কুইন্সল্যান্ডে অবস্থিত, যা অস্ট্রেলিয়ার আনারস উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। দেশটিতে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রিত সব আনারসই এই রাজ্যে উৎপাদিত হয়। এখানকার সানশাইন উপকূলে আনারসের ১৬ মিটার উঁচু একটি বিশাল ভাস্কর্য রয়েছে। ফাইবারগ্লাসের তৈরি ‘দ্য বিগ পাইনঅ্যাপল’ নামের এই ভাস্কর্যটি ওই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ, যেখানে পর্যটকেরা নিয়মিত ছবি তুলতে ভিড় করেন।
তবে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের দাবি, তাম্বুরেলার বিরুদ্ধে শুধু আনারস সংক্রান্ত অভিযোগই ছিল না। তাঁর বিরুদ্ধে বাজে ভাষা ব্যবহার, অসংলগ্ন কথা বলা এবং কাজের বিষয়ে নির্দেশনা দিলে রাগ দেখানোর মতো অভিযোগও ছিল।
আদেশে আরও একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গত এপ্রিলে কর্মক্ষেত্রে ক্ষুব্ধ হয়ে একটি লোহার রেলিংয়ে প্রচণ্ড আঘাত করেন তাম্বুরেলা, যার ফলে তাঁর ডান হাতের হাড় ভেঙে যায়। তাম্বুরেলা আশা করেছিলেন যে, রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ তাঁকে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাসের ভিসা পেতে সহায়তা করবে। কিন্তু চাকরি চলে যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ সেই প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দেয়। নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পর তিনি অভিযোগ জমা দেওয়ায় কমিশন তাঁর আবেদনটি বাতিল করে দেয়।
রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এলিয়ট ইনগ্রাম ডেইলি মেইলকে বলেন, “ঘটনাটি শুধু পিৎজার ওপর আনারস দেওয়া বা না–দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে আরও কারণ রয়েছে।”
অন্যদিকে, পেশাজীবীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে তাম্বুরেলা লিখেছেন যে, তিনি তাঁর পুরো ক্যারিয়ারে সর্বদা উচ্চমানের খাবার তৈরি এবং ব্যবসার উন্নতির দিকে মনোনিবেশ করেছেন। তিন মাস আগে তিনি শেফদের উদ্দেশ্যে একটি খোলাচিঠি পোস্ট করেছিলেন, যার মূল কথা ছিল, “খাবারের উপকরণের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো”।
বর্তমানে তাম্বুরেলা ব্রিসবেনেরই অন্য একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাঁর বর্তমান কর্মস্থলের খাবারের তালিকায় আনারস দিয়ে তৈরি কোনো পদের উল্লেখ নেই।