‘আমারার ঝিটা (মেয়ে) কম কথা কইত, বাইরা (বাইরের) মানুষের লগে মেলামেশা করত না। বুদ্ধিসুদ্ধি কম আছিল। আমরার ঝিয়ের এত বড় ক্ষতি যে করল, এইটার শক্ত বিচার চাই।’

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এক তরুণীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শোকে ভেঙে পড়েছেন তাঁর পরিবার। বাড়ির উঠানে বসে এভাবেই বিলাপ করছিলেন নিহতের মা নারগিস বেগম (৪০)।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন ওই তরুণী। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর পরদিন সকালে এক প্রতিবেশীর বাগানে তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। এই নৃশংস ঘটনার পর নিহতের বাবা, যিনি পেশায় একজন রিকশাচালক, অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে জুড়ী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার এজাহারে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, দুর্বৃত্তরা তাঁর মেয়েকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে।

ঘটনার পর থেকে শোকাতুর বাবা ও মা দিশেহারা। কান্নায় ভেঙে পড়ে বাবা বলেন, ‘আমার মাইয়াটারে কেউ ফুসলাইয়া নিয়া ক্ষতি করি মারছে। এইটা কি মানুষের কাম হইতে পারে? জিঘান আশপাশের মানুষরে, আমি তো কেউর কোনো ক্ষতি করছি না, কেউর লগে দুশমনিও নাই। রিকশা চালাই খাই। আমার এই ক্ষতিটা কে, কেন করল?’

জুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, নিহিত তরুণীকে ধর্ষণ করে হত্যা করার আলামত পাওয়া গেছে। তিনি আরও জানান, এই অপরাধে এক বা একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে এবং পুলিশ অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে।

বৃহস্পতিবার সকালে ওই তরুণীর বাড়িতে ভিড় জমেছিল প্রতিবেশীদের। উঠানে বসে বিলাপ করছিলেন মা নারগিস বেগম, আর তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশী নারীরা। পাশে একটি চেয়ারে মাথা নিচু করে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন মেয়েটির বাবা। এরই মধ্যে পুলিশের ফোন পেয়ে তাঁরা রিকশায় করে থানায় রওনা হন।

মেয়েটির বাবা জানান, তাঁদের দুই মেয়ে ও দুই ছেলে রয়েছে। বড় মেয়েকে কয়েক বছর আগে বিয়ে দেওয়া হলেও পারিবারিক কলহের কারণে সে বর্তমানে বাবার বাড়িতেই থাকছে। অন্যদিকে ছোট মেয়েটি শৈশব থেকেই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছিল।

স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত তিন নভেম্বর মাগরিবের আজানের পর থেকে মেয়েটির কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। আশপাশে ব্যাপক খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর সন্ধান মেলেনি। পরদিন সকালে এলাকায় মাইকিং করার পর প্রতিবেশীর বাড়ির বাগানে একটি লাশ পড়ে থাকার খবর পাওয়া যায়। স্বজনরা সেখানে গিয়ে লাশটি শনাক্ত করেন এবং জানান যে এটি তাঁদের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মেয়ের দেহ। দেখা যায়, তাঁর পরনের ওড়না দিয়ে গলা শক্ত করে বাঁধা ছিল এবং পরনের কাপড় এলোমেলো অবস্থায় ছিল।

খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। পরবর্তীতে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি মৌলভীবাজার জেলা সদরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

স্থানীয় বিএনপি নেতা ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম জানান, অতীতে এই এলাকায় এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তিনি এই বর্বরোচিত ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।