বাহরাইনে মৃত্যুবরণ করা এক বোনের রেখে যাওয়া জমি ও অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ভাগনেদের সঙ্গে মামাদের দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দায়ে পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন মানিকগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত। এছাড়া আট আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং আরও সাতজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেকের জন্য অর্থদণ্ডের আদেশও দিয়েছেন আদালত।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে মানিকগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ এস কে এম তোফায়েল হাসান এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।

আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন সিঙ্গাইরের গোবিন্দল গ্রামের মো. জিয়ার উদ্দিন (৫০), জাহিদুল ইসলাম (৫৫), আবদুর রশিদ (৫০), জসিম উদ্দিন (৪৫) ও সিদ্দিক মিয়া (৫৫)। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এই পাঁচজনের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে, যা অনাদায়ে তাঁদের আরও চার মাস কারাবাস করতে হবে।

মামলার প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, হাসিনা আক্তার কাজের সূত্রে বাহরাইনে গিয়েছিলেন। প্রবাসে থাকাকালীন তিনি তাঁর বড় বোন রাজিয়ার কাছে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২৮ লাখ টাকা পাঠান। এই অর্থের মাধ্যমে প্রায় ৩৬ শতক জমি কেনা হয়। তবে অভিযোগ উঠেছে যে, বাকি টাকা রাজিয়ার ছেলে আবদুর রশিদ, জাহিদুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন আত্মসাৎ করেন এবং কেনা জমির দখলও তাঁরাই করে নেন।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন একই গ্রামের জহির উদ্দিন (৭৫), মো. আজিজুল (৪৩), উজ্জ্বল হোসেন (৪৫), সামছুল হক (৭৫), মো. সালাউদ্দিন (৫৫), মাজেদ মিয়া (৪৫), মো. মরণ (৪৭) ও স্বপন মিয়া (৩৮)। তাঁদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে, যা অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

এছাড়া মামলার অন্যান্য আসামিদের মধ্যে শামীম হোসেন ও হাবু মিয়াকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাঁদের আরও দুই মাস কারাবাস করতে হবে। পাশাপাশি আসামি মজনু মিয়াকে এক বছর, রাজিয়া খাতুন ও সুফিয়া খাতুনকে ছয় মাস এবং সাহেরা খাতুন ও খাতুনী বেগমকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় উজ্জ্বল মিয়া, অলি আহাদ, মো. শুকুর ও মো. রাজা নামের চার আসামিকে আদালত খালাস দিয়েছেন।

এজাহার ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিঙ্গাইর উপজেলার গোবিন্দল গ্রামের মৃত দিরগজ মোল্লার তিন ছেলে নান্নু মোল্লা, অহেদ আলী মোল্লা ও করিম মোল্লা এবং তিন মেয়ে রাজিয়া বেগম, হেলেনা বেগম ও হাসিনা আক্তার। নিঃসন্তান হাসিনা আক্তার বাহরাইনে মৃত্যুবরণ করলে তাঁকে সেখানেই দাফন করা হয়। এরপর থেকেই তাঁর রেখে যাওয়া অর্থ ও জমির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে মামাদের সঙ্গে ভাগনেদের তীব্র বিরোধ শুরু হয়। বিষয়টি মীমাংসার জন্য গ্রামে একাধিকবার সালিশ হলেও কোনো সমাধান আসেনি।

২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে এই বিরোধ চরম রূপ নেয়। জমি ও টাকার ভাগ নিয়ে বল্লম, টেঁটা, রামদা ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায় আসামিরা। এই রক্তক্ষয়ী হামলায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান নান্নু মোল্লা (৬০) ও তাঁর চাচাতো ভাই আজিজ মোল্লা (৫০)। হামলায় গুরুতর আহত হন নান্নুর ভাই করিম মোল্লা (৪৮) ও স্ত্রী কমলা বেগম (৪৫)। পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করিম মোল্লাও মারা যান।

ঘটনার পরদিন নিহত আজিজ মোল্লার স্ত্রী ফরিদা বেগম বাদী হয়ে ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে সিঙ্গাইর থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুর রহমান ২৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বিচার প্রক্রিয়ায় মোট ২১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের মামলাটি পরিচালনা করেন সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) নূরতাজ আলম বাহার এবং আসামিপক্ষের আইনজীবী ছিলেন খলিলুর রহমান।

পিপি নূরতাজ আলম বাহার জানান, “১০ বছর পর বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালতের বিচারক আলোচিত এই তিন হত্যা মামলায় পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড, আটজনকে যাবজ্জীবন এবং সাতজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ ছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় চারজনকে খালাস দেন।”

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী খলিলুর রহমান এই রায়ের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, “এ রায় যথোপযুক্ত হয়নি। এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।”