সন্তান মিথ্যা বলছে—এই সত্যটি সামনে আসার পর অধিকাংশ অভিভাবকই চরম হতাশ হয়ে পড়েন এবং রাগের মাথায় প্রতিক্রিয়া দেখান। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিভাবকেরা সন্তানকে তীব্র ধমক দেন কিংবা বকাঝকা করেন। কেউ কেউ আবার সন্তানের ওপর থেকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের মনে এই প্রশ্ন জাগে যে, সন্তান কি তবে ভালো মানুষ হয়ে উঠছে না? তাকে কি আরও কঠোর শাসনে রাখা প্রয়োজন? তবে মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শিশুরা সব সময় খারাপ উদ্দেশ্যে মিথ্যা বলে না। অনেক সময় শাস্তির ভয় থেকে, কখনো নিজের সুবিধার জন্য, আবার কখনো অন্যের মনে কষ্ট না দেওয়ার তাগিদেও তারা মিথ্যা আশ্রয় নিতে পারে। শিশুদের সততা ও সামাজিক বিকাশ নিয়ে গবেষণার আলোকে কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ভিক্টোরিয়া তালওয়ার অভিভাবকদের পাঁচটি প্রচলিত ভুল ধারণা তুলে ধরেছেন।

অধ্যাপক তালওয়ারের মতে, প্রায় সব শিশুই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে মিথ্যা বলে। তাই সন্তান মিথ্যা বললেই তাকে খারাপ শিশু হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো কারণ নেই; বরং কেন সে মিথ্যা বলছে, তা গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করা উচিত। কারণটি সঠিকভাবে বুঝতে পারলে তাকে সততার গুরুত্ব বোঝানো এবং সঠিক আচরণ শেখানো অনেক সহজ হয়ে যায়।

শৈশবে মাঝেমধ্যে মিথ্যা বলাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা, নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং সামাজিক পরিস্থিতি সামলানোর দক্ষতা গড়ে ওঠার সঙ্গে এই মিথ্যা বলার একটি সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে শিশুকে মিথ্যা বলতে উৎসাহ দিতে হবে। বরং গল্প, আলোচনা এবং নিজেদের আচরণের মাধ্যমে তাকে সত্য বলার গুরুত্ব শেখানো প্রয়োজন।

অনেক অভিভাবক মনে করেন কঠোর শাস্তি দিলে সন্তান সত্য কথা বলবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কঠোর শাস্তির ভয়ে শিশু সাময়িকভাবে মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকতে পারে, কিন্তু শাস্তির ভয় যদি খুব বেশি হয়, তবে সে সত্য স্বীকার না করে বরং নিজের ভুল লুকানোর জন্য আরও জটিল মিথ্যা বলতে পারে। তাই শুধু শাস্তি দেওয়ার বদলে সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন। সে যখন সত্য বলবে, তখন তার প্রশংসা করুন। ভুল করলে তার ধরন ও বয়স অনুযায়ী যুক্তিসংগত ব্যবস্থা নিন।

মনে রাখতে হবে, শাস্তি এড়াতে মিথ্যা বলা আর কারও মনে কষ্ট না দিতে সত্য গোপন করা এক বিষয় নয়। আবার নিজের সুবিধা আদায়ের জন্য মিথ্যা বলার উদ্দেশ্যও সম্পূর্ণ আলাদা। তাই সব মিথ্যাকে একইভাবে বিচার করবেন না। কোন পরিস্থিতিতে এবং কেন সন্তান মিথ্যা বলেছে, তা বোঝার চেষ্টা করুন। সেই অনুযায়ী তাকে সত্য বলার গুরুত্ব বোঝান।

সন্তানের মিথ্যা অনেক সময় অভিভাবকের বিশ্বাসে আঘাত করতে পারে। তবে একটি মাত্র ঘটনা দিয়ে তার চরিত্রের চূড়ান্ত বিচার করা ঠিক নয়। বিশ্বাস গড়ে ওঠে দীর্ঘদিনের আচরণ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে। তাই সন্তান মিথ্যা বললে তাকে অবিশ্বাস করার বদলে বিষয়টি নিয়ে সহানুভূতির সঙ্গে কথা বলুন। সততা, বিশ্বাস এবং সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝানোর সুযোগ হিসেবে এই ঘটনাটিকে কাজে লাগান।

সূত্র: সাইকোলজি টুডে