রাজধানীর ডেমরায় অবস্থিত সামসুল হক খান স্কুল চীনের কাছ থেকে ১ লাখ ডলার মূল্যের দুটি ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ উপহার হিসেবে পেয়েছে। এই আধুনিক ক্লাসরুম দুটিতে কম্পিউটারসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী স্থাপন করা হয়েছে।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে প্রতিষ্ঠানটিতে এই ক্লাসরুম দুটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং এবং বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন।

এই বিশেষ আয়োজন উপলক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে ‘লাইটিং আপ দ্য ফিউচার’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মূল অনুষ্ঠানের আগে দুই দেশের মন্ত্রী স্মার্ট ক্লাসরুম দুটি পরিদর্শনে যান এবং সেখানে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

অনুষ্ঠানে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন বলেন, “চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব শুধু চুক্তি বা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না সরকার। এই বন্ধুত্বের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চায়। সে জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

ডেমরার সামসুল হক খান স্কুলকে এই প্রকল্পের জন্য নির্বাচন করার কারণ ব্যাখ্যা করে শিক্ষামন্ত্রী জানান, সাধারণ মানুষের এলাকা থেকেই শিক্ষার উন্নয়নের যাত্রা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। আর সেই লক্ষ্যেই এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে স্মার্ট ক্লাসরুম প্রকল্পের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে।

কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে এহসানুল হক মিলন বলেন, “শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতে হবে।” তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি চীন সফরকালে তিনি দেশটির কারিগরি শিক্ষার অভাবনীয় অগ্রগতি প্রত্যক্ষ করেছেন। এই বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে প্রশিক্ষণ ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের এই দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে।

পরবর্তীতে চীনা প্রতিনিধি লিউ হাইসিং তাঁর বক্তব্যে বলেন, “বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্ব দীর্ঘদিনের। দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। আগের প্রজন্মের নেতারা এই সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করেছেন। এখন তরুণদের দায়িত্ব তা আরও এগিয়ে নেওয়া।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ১০ বছর আগে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। লিউ হাইসিং বলেন, “এ বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। এই সফরে দুই দেশের মধ্যে ৩০টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। এর মধ্যে শিক্ষাবিষয়ে সমঝোতাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।”

ঢাকার এই নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুটি স্মার্ট ক্লাসরুম উপহার প্রদানকে দুই দেশের নেতাদের শিক্ষাবিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকারের একটি বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন লিউ হাইসিং। তিনি জানান, ক্লাসরুম দুটিতে চীনের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল জগতের সঙ্গে পরিচিত হতে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে সহায়তা করবে।

চীনা মন্ত্রী আরও জানান, শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর দেশ থেকে স্কুলব্যাগ, বই ও ফুটবল আনা হয়েছে। তিনি বলেন, “এগুলো চীনের জনগণ ও কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে উপহার। এসব উপহার বাংলাদেশের মানুষের প্রতি চীনের ভালোবাসার প্রকাশ।” তিনি শিক্ষার্থীদের এই সামগ্রীগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।

শিক্ষার্থীদের পরিবেশন করা চীনা ভাষার গানের প্রশংসা করে লিউ হাইসিং বলেন, শিক্ষার্থীদের উষ্ণ অভ্যর্থনার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের মানুষের চীনের প্রতি ভালোবাসা অনুভব করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের মানুষের যোগাযোগ হাজার বছরের পুরনো এবং প্রাচীনকাল থেকেই সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান।

বেইজিং থেকে বাংলাদেশের প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন লিউ হাইসিং। তিনি বলেন, এই সফরের মাধ্যমে তাঁরা চীনের ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো দেখার সুযোগ পাবেন, যা দুই দেশের মানুষের সম্পর্ককে আরও গভীর করবে। তাঁর মতে, আজকের শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্বকে আরও সমৃদ্ধ করবেন এবং এই বন্ধুত্ব পদ্মা ও ইয়াংজি নদীর মতো প্রবহমান থাকবে।

অনুষ্ঠানে চীনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের ফুটবল, স্কুলব্যাগ, বইসহ বিভিন্ন শিক্ষাসামগ্রী ও ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. মাহবুবুর রহমান মোল্লা জানান, শিক্ষার্থীরা এই ক্লাসরুম ব্যবহারের মাধ্যমে চীনা ভাষা শেখার পাশাপাশি প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষা অর্জন করতে পারবে।

১ লাখ ডলারের দুটি স্মার্ট ক্লাসরুম পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির জন্য অত্যন্ত আনন্দের ও গর্বের বিষয় বলে উল্লেখ করেন অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান মোল্লা। তিনি বলেন, “এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ আরও বাড়াবে। এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়তে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”