সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি করিয়েছেন আব্দুল মালেক (৫৬)। নিজের নামে একটি মোবাইল সিম নিবন্ধন করতে গিয়ে তিনি এক চরম বিস্ময়কর তথ্যের মুখোমুখি হন। জানতে পারেন, তার এনআইডির বিপরীতে আগে থেকেই ১৮টি সিম নিবন্ধিত রয়েছে। অথচ আব্দুল মালেকের দাবি, তিনি নিজে কোনো সিমই তোলেননি। এই ঘটনায় দায় কার, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা একে অন্যের দিকে দায় ঠেলছেন।

ভুক্তভোগী আব্দুল মালেক চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার পূর্ব ফতেপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ লুধুয়া গ্রামের মোল্লা বাড়ির বাসিন্দা। তার বাবার নাম মৃত নোয়াব আলী।

যেভাবে বিষয়টি সামনে এলো

আব্দুল মালেক জানান, দীর্ঘদিন সৌদি আরবে অবস্থান করার কারণে আগে তার জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়নি। দেশে ফিরে প্রায় দুই মাস আগে তিনি এনআইডির জন্য আবেদন করেন এবং এক সপ্তাহ আগে কার্ডটি হাতে পান। এরপর সুজাতপুর বাজারের একটি কম্পিউটারের দোকানে নিজের নামে সিম নিবন্ধন করতে গেলে দোকানদার তাকে জানান, তার এনআইডির বিপরীতে আগে থেকেই ১৮টি সিম নিবন্ধিত রয়েছে।

বিষয়টি যাচাই করতে তিনি চাঁদপুরের বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের কার্যালয়ে যান। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রবির নামে দুটি, বাংলালিংকের চারটি এবং টেলিটকের নামে ১২টি সিম নিবন্ধিত রয়েছে। তবে গ্রামীণফোনের নামে কোনো সিম পাওয়া যায়নি বলে তিনি জানান।

মালেকের দাবি, রবির দুটি সিম ইতিমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। তবে বাংলালিংকের চারটি সিম বাতিল করার জন্য তাকে ঢাকায় যেতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, টেলিটকের নামে নিবন্ধিত ১২টি সিমের মধ্যে তিনটি বাতিল করা হয়েছে এবং বাকি সিমগুলো ধাপে ধাপে বাতিল করার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

‘আমি তো একটা সিমও তুলিনি, নিবন্ধন করল কারা?’

নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে আব্দুল মালেক বলেন, “আমি তো একটা সিমও তুলিনি। এই সিমগুলো তুলল কারা, কী ভালো-মন্দ কাজে ব্যবহার হচ্ছে, কিছুই জানি না। কষ্ট করে কয়েকটি সিম বাতিল করিয়েছি। কিন্তু ভবিষ্যতে আবার যদি ওই চক্র সিম তুলে নেয়, তখন আমি কী করব?”

তিনি আরও দাবি করেন, জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির সময় তিনি শুধু নির্বাচন অফিসেই আঙুলের ছাপ দিয়েছেন, এর বাইরে অন্য কোথাও আঙুলের ছাপ দেননি। তাহলে তার পরিচয়পত্রের তথ্য কিংবা আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে কীভাবে এতগুলো সিম নিবন্ধন করা হলো, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

এ ঘটনায় থানায় যোগাযোগ করলে তাকে নির্বাচন অফিসে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে জানান মালেক। তার আশঙ্কা, এসব সিম ব্যবহার করে কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটালে তিনি চরম হয়রানির শিকার হতে পারেন। মালেকের দাবি, শুধু সিমগুলো বাতিল করাই যথেষ্ট নয়; ভবিষ্যতে যেন তার পরিচয়পত্র ব্যবহার করে নতুন করে কোনো সিম নিবন্ধন করা না যায়, সে জন্যও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

মতলব উত্তর উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি শামসুজ্জামান ডলার বলেন, একজন নাগরিকের অজান্তে তার এনআইডির বিপরীতে ১৮টি সিম নিবন্ধনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও সিম নিবন্ধন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

দায় এড়াতে চায় সংশ্লিষ্টরা

এই বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সুলতানা এলিন বলেন, “আমার চাকরিজীবনে এ ধরনের ঘটনা প্রথম দেখলাম। একজন ব্যক্তির আঙুলের ছাপ ছাড়া কীভাবে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এতগুলো সিম নিবন্ধন করা সম্ভব, তা আমার বোধগম্য নয়। তবে আমাদের অফিসের সার্ভার হ্যাক করা সম্ভব নয় বলে আমি মনে করি। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে বিষয়টি যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।”

অন্যদিকে, চাঁদপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান খলিফা বলেন, “এটার দায়ভার আমাদের নয়। এই দায়ভার নিতে হবে সিম কোম্পানিগুলোকে।”

চাঁদপুর বিটিসিএলের সহকারী ব্যবস্থাপক হাসিব আহম্মেদ জানান, “এসব বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করি না। এটি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) বিষয়।”