১৭৮৭ সালের ২৮ অক্টোবর, ম্যানচেস্টার ক্যাথেড্রালের মিম্বরের দিকে এগিয়ে যান দাসপ্রথাবিরোধী প্রচারক থমাস ক্লার্কসন। সেই সময়ে দাসদের ওপর চালানো চরম বর্বরতা এবং তাদের মৌলিক মানবিক অধিকার পুনরুদ্ধারের বিষয়ে তিনি অত্যন্ত আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের কথা স্মরণ করে ক্লার্কসন বলেছিলেন, ‘সে দুঃখের পেয়ালা পান করছে, আর সে পেয়ালা আমরাই তার হাতে তুলে দিচ্ছি।’

ব্ল্যাক হিস্ট্রি মাসে এই ধরণের ঘটনাগুলো স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ এগুলো আমাদের ইতিহাসের জটিল ও রূঢ় সত্যের মুখোমুখি করে। ক্লার্কসনের সেই জোরালো বক্তব্যের পর ম্যানচেস্টারের হাজার হাজার মানুষ দাসপ্রথাবিরোধী আবেদনে স্বাক্ষর করেছিলেন। তবে এখানে একটি বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়; যে ম্যানচেস্টারের তুলাশিল্প একসময় সমৃদ্ধ হয়েছিল, তা গড়ে উঠেছিল মূলত দাসদের কঠোর শ্রমের ওপর ভর করেই। ব্রিটেন একদিকে যেমন দাসপ্রথা বিলোপের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেওয়া বীরদের দেশ, অন্যদিকে একসময় মানুষ কেনাবেচার অমানবিক ব্যবসায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া দেশ হিসেবেও পরিচিত।

আটলান্টিক মহাসাগরীয় দাস ব্যবসা ছিল মানব ইতিহাসের এক চরম নির্মম ও বর্বর অপরাধ। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের সব ধরণের মানবিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে মানুষকে কেবল সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং মৃত্যু পর্যন্ত তাদের খাটানো হতো। এই দাসপ্রথার কারণে লাখ লাখ মানুষ যে অকথ্য যন্ত্রণা ও কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছেন, তার জন্য আমি গভীর দুঃখ ও অনুশোচনা প্রকাশ করছি। একই সঙ্গে বর্তমান বিশ্ব গঠনে এই অন্ধকার অধ্যায়ের প্রভাবকেও আমি স্বীকার করছি।

আমাদের ইতিহাস এমন কিছু দেশের সঙ্গে জড়িত, যারা বর্তমানে আমাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র—বিশেষ করে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো। আগামী সপ্তাহে আমি কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছি। বর্তমানের এই ক্রমবর্ধমান বিভক্ত ও বিপজ্জনক বিশ্বে কমনওয়েলথের দেশগুলোর মধ্যকার ঐক্য আমাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ঐক্য আমাদের স্থায়িত্ব, শক্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। আমরা যদি একসঙ্গে থাকি, তবে যেকোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারি এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারি। আমাদের দেশগুলোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি যৌথ মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি নিরাপদ বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব।

তবে এক হয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হলে আমাদের একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হলে আমাদের অতীতকে সাহসের সাথে স্বীকার করতে হবে। বছরের পর বছর ধরে দাসপ্রথায় ক্ষতিগ্রস্ত কমনওয়েলথ সদস্য দেশগুলো এই ইতিহাসের প্রভাব নিয়ে একটি সৎ ও উন্মুক্ত আলোচনার দাবি জানিয়ে আসছে। অতীত থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখে আমরা মূলত কমনওয়েলথের সক্ষমতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছি।

কমনওয়েলথের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার জন্য এসব কঠিন ও স্পর্শকাতর বিষয়ে আলোচনা করাটাই এখন সঠিক পদক্ষেপ। এটি একই সঙ্গে একটি দেশপ্রেমের দায়িত্বও বটে। শুধু সংকীর্ণ স্বার্থের জন্য নয়, বরং আমি যে ব্রিটেনে বিশ্বাস করি, তা আত্মবিশ্বাসী, মার্জিত ও সাহসী। দাসপ্রথা বিলোপে আমরা একসময় বিশ্বকে পথ দেখিয়েছি; আজও আমরা সেই নেতৃত্ব দিতে পারি।

তাই দাস ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সঙ্গে আমরা একটি গঠনমূলক আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছি। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিও আমরা গুরুত্বের সাথে শুনব এবং আমি এই দাবির বিষয়ে উন্মুক্ত মানসিকতা রাখছি। অনেকে আর্থিক ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছেন। তবে আমি মনে করি, এটি সঠিক সমাধান নয়। ভিন্ন যুগে, ভিন্ন আইনের অধীন ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক অপরাধের জন্য আজ বর্তমান ব্রিটিশ জনগণকে দায়ী করা যায় না। কারণ, এসব অন্যায়ে বর্তমান প্রজন্মের কোনো ভূমিকা ছিল না। আমার মূল লক্ষ্য হলো দেশে ও বিদেশে সব মানুষের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।

তাই কমনওয়েলথ পরিবার এবং এর বাইরের সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে—এমন সমস্যাগুলো সমাধানের মানসিকতা নিয়ে আমরা সম্মেলনে যাব। অতীতের মুখোমুখি হয়ে এবং সবার জন্য সমতা, নিরাপত্তা ও আশা নিশ্চিত করাই এর একমাত্র উপায়।

ব্রিটিশ ইতিহাসে প্রায়ই দেখা গেছে, যেসব বড় অন্যায়কে ক্ষমতাসীনেরা এড়িয়ে গেছেন, সাধারণ মানুষই শেষ পর্যন্ত সেগুলো রুখে দিয়েছেন। ম্যানচেস্টারের শ্রমিকেরা ব্রিটেনের সেই গর্বিত ঐতিহ্যেরই প্রতিনিধিত্ব করেন।

— অ্যান্ডি বার্নহ্যাম
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী
(দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত)