ময়মনসিংহের সদর উপজেলার কিসমত গ্রামের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান অরনীকা জামান আঁখি। তাঁর বাবা আশরাফুজ্জামান একজন কৃষক এবং মা দেলোয়ারা বেগম গ্রামীণ ব্যাংকের একজন সদস্য। পরিবারের সীমিত আয়ের কারণে সংসার পরিচালনা এবং পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করা তাঁদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবে পারিবারিক অসচ্ছলতা সত্ত্বেও অদম্য ইচ্ছা ও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে গেছেন অরনীকা। জীবনের সব প্রতিকূলতা জয় করে তিনি হয়ে উঠেছেন তাঁর পরিবারের প্রথম গ্র্যাজুয়েট নারী। প্রবল ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে এই তরুণী নিজের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে নিয়েছেন।

আর্থিক সংকটের কারণে যখন আঁখির পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে তাঁর পাশে দাঁড়ায় আইডিএলসি এবং মুক্তকণ্ঠ ট্রাস্ট। ২০১৮ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘অদ্বিতীয়া’ শিক্ষাবৃত্তি লাভ করেন। এই বৃত্তির অর্থ তাঁর পড়াশোনার খরচ এবং দৈনন্দিন ব্যয়ভারের চাপ সম্পূর্ণভাবে দূর করে দেয়, যার ফলে তাঁর পরিবারকে আর কোনো অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি। মানসিক প্রশান্তি ও স্বস্তি পেয়ে আঁখি তাঁর পুরো মনোযোগ পড়াশোনার প্রতি নিবদ্ধ করেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন (এইউডব্লিউ) থেকে অর্থনীতি বিষয়ে সফলভাবে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন তিনি।

স্নাতক শেষ করার পরপরই পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয় আঁখিকে। জীবিকার তাগিিদতে তিনি বিভিন্ন চাকরির ইন্টারভিউতে অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত নিজের প্রাক্তন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান তিনি। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি এইউডব্লিউ-তে অ্যাডজাঙ্কট্ ম্যাথ ফ্যাকাল্টি হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ২০২৩ সালের মে মাসে তিনি জুনিয়র ম্যাথ ফ্যাকাল্টি হিসেবে স্থায়ী নিয়োগ পান।

নিজের শিক্ষকতা পেশার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে আঁখি বলেন, ‘আমার ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা শেষ করেই চাকরিতে যোগ দেওয়ার, কারণ পরিবারকে দেখাশোনা করতে হবে। প্রথমে বেসরকারি সংস্থায় কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও পরে মনে হলো নিজের বিশ্ববিদ্যালয়েই সুযোগ পেলে সেখানে করাটাই শ্রেয়। শেষ পর্যন্ত সেখানেই সুযোগ পেয়েছি এবং শিক্ষকতা দারুণভাবে উপভোগ করছিলাম।’

তবে শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ছিল আঁখির মনে। সেই স্বপ্ন পূরণে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে এবার তিনি পাড়ি জমিয়েছেন ইউরোপে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানি গমন করেন। বর্তমানে তিনি জার্মানির অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বন ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত আছেন।

ময়মনসিংহের কিসমত গ্রামের এক সাধারণ পরিবার থেকে শুরু হওয়া অরনীকার এই দীর্ঘ পথচলা এটিই প্রমাণ করে যে, অভাব কখনোই মেধার পথে বাধা হতে পারে না; যদি থাকে অদম্য ইচ্ছা এবং সঠিক সুযোগের সহায়তা।