ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ পৌরসভার প্রতিষ্ঠা ১৯৯০ সালের ১৪ মার্চ। প্রতিষ্ঠার ৩৬ বছর পেরিয়ে গেলেও পৌর এলাকার সড়ক যোগাযোগ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত নানা সমস্যায় জর্জরিত পৌরবাসী। শহরের অনেক সড়ক চলাচলের অনুপযোগী, কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত, আবার কোথাও বৃষ্টির পানি জমে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।
এসব সমস্যা সমাধানে এবার ৪৫টি অগ্রাধিকারভিত্তিক উন্নয়ন প্রকল্পের তালিকা তৈরি করেছে পৌর কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ের সংক্ষিপ্ত তালিকায় সাতটি প্রকল্প রাখা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ কোটি ৩৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
পৌরসভার ডিটেইলস অব প্রাইওরিটি সাব-প্রজেক্ট শীর্ষক নথিতে এসব তথ্য উল্লেখ রয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর এসব উন্নয়নকাজের জন্য আবেদন করা হয়। প্রকল্পগুলোর অর্থায়নের উৎস হিসেবে বিশ্বব্যাংক এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নাম উল্লেখ করা হয়েছে। বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে কালীগঞ্জ পৌরসভা।
প্রথম পর্যায়ের সাতটি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে আড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে খুলনা-কুষ্টিয়া মহাসড়ক (খাল) পর্যন্ত আরসিসি রাস্তা, ড্রেন ও সড়কবাতি নির্মাণ। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। কলাহাট ডাকবাংলো থেকে কালীবাড়ি হয়ে নলডাঙ্গা সড়কের মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা, ড্রেন ও সড়কবাতি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
এ ছাড়া নলডাঙ্গা সড়কের আসাদ সাহেবের বাড়ি থেকে চিত্রা নদী পর্যন্ত রাস্তা, আরসিসি ড্রেন ও সড়কবাতি নির্মাণসহ কয়েকটি সংযোগ সড়ক ও ড্রেন নির্মাণে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৬ কোটি ৫ লাখ টাকা। হেলাই মামুন টি-স্টোর থেকে মাজেদের বাড়ি ও দক্ষিণপাড়া ঈদগাহ মাঠ হয়ে চিত্রা নদী পর্যন্ত রাস্তা, ড্রেন ও সড়কবাতি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে খাদ্যগুদাম মসজিদ থেকে বালিদাপাড়া খাল পর্যন্ত আরসিসি ড্রেন নির্মাণ এবং সুবল ড্রাইভারের বাড়ি থেকে চিত্রা নদী পর্যন্ত রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। নিমতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে গোঁসাই বাড়ি হয়ে চিত্রা নদী পর্যন্ত রাস্তা, ড্রেন ও সড়কবাতি নির্মাণসহ কয়েকটি সংযোগ সড়ক নির্মাণে ১২ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং বলিদাপাড়া পূর্বপাড়া জামে মসজিদ থেকে বড় রায়গ্রাম পর্যন্ত রাস্তা, ড্রেন ও সড়কবাতি নির্মাণসহ সংযোগ সড়ক ও ড্রেন নির্মাণে ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ৪৫টি প্রকল্পের বিস্তারিত তালিকায় পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের আরও উন্নয়নকাজের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে গান্না রোডের পুকুর সড়ক, মুরগি হাট থেকে কলাহাটা সড়ক, কাশীপুর সড়ক, ফয়লা, হেলাই, বালিদাপাড়া, আড়পাড়া, ঈশ্বরবা ও নলডাঙ্গা রোডসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তা ও ড্রেন উন্নয়নের কথা উল্লেখ রয়েছে। পাশাপাশি বাসস্ট্যান্ডে সুপার মার্কেট এবং কিচেন মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
পৌরসভার বর্তমান উন্নয়নকাজের মধ্যে বলিদাপাড়া সড়কের ১ হাজার ৮৫ মিটার এবং শ্রীরামপুর সড়কের ১ হাজার ২৯০ মিটার উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া শহরের প্রধান বাসস্ট্যান্ড থেকে বড়বাজার সড়ক, থানা সড়কসহ কয়েকটি সড়কের দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তবে বর্ষার কারণে ঠিকাদাররা এখনো এসব সড়কের উন্নয়নকাজ শুরু করেননি। পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দ্রুত এসব কাজ শুরু করা হবে।
এদিকে, এলজিইডির কালীগঞ্জ পৌরসভার মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সালের জরিপে শহর ও পৌর এলাকার মোট সড়ক নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ছিল ১০৯ দশমিক ৭৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে পৌরসভার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৯৭ কিলোমিটার সড়কের উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, বর্তমান দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পৌর এলাকায় পাকা রাস্তা ৬৫ কিলোমিটার, কাঁচা রাস্তা ৩৫ কিলোমিটার, আধাপাকা রাস্তা ২৫ কিলোমিটার এবং সিসি বা আরসিসি রাস্তা সাড়ে ৪ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে সড়কের দৈর্ঘ্য ১২৯ দশমিক ৫ কিলোমিটার।
তবে ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের আওতায় ঝিনাইদহ বাস টার্মিনাল থেকে কালীগঞ্জের মাহতাব উদ্দিন সরকারি ডিগ্রি কলেজ পর্যন্ত ১৫ দশমিক ৯ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এটি পৌরসভার অভ্যন্তরীণ সব রাস্তা নির্মাণের প্রকল্প নয়।
পৌর এলাকার সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। পথচারী কামাল হোসেন বলেন, পৌর এলাকার বিভিন্ন সড়কে চলাচল করতে গিয়ে প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়তে হয়। কোথাও রাস্তা ভাঙাচোরা, আবার কোথাও বৃষ্টির পানি জমে চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হয়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেও অনেক এলাকায় পানি জমে থাকে। তিনি এসব সমস্যা সমাধানে প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানান।
আরেক পথচারী সুজন হোসেন বলেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানবাহন ও মানুষের চলাচল বাড়লেও সে তুলনায় সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়নি। অনেক স্থানে সড়কের পাশে পর্যাপ্ত ড্রেন না থাকায় পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হয়। এতে পথচারীসহ সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তিনি শুধু নতুন রাস্তা নির্মাণ নয়, পুরোনো সড়ক সংস্কার এবং পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, সড়কের বেহাল অবস্থা ও পানি নিষ্কাশনের সমস্যার কারণে ক্রেতাদের দোকানে আসতে অসুবিধা হয়। বৃষ্টির সময় অনেক স্থানে কাদা ও পানি জমে থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকার উন্নয়নকাজ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য তিনি পৌর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রবীণ সাংবাদিক আনোয়ারুল ইসলাম রবি বলেন, একটি পৌরসভার উন্নয়ন শুধু রাস্তা নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সড়কবাতি, বাজার ও নাগরিক সুবিধার সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। কালীগঞ্জ পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ৩৬ বছর পার করলেও শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়নে আরও পরিকল্পিত উদ্যোগ দরকার। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কাজের মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তিনি আবেদন জানান।
কালীগঞ্জ পৌরসভার প্রকৌশলী কবির হাচান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পৌরসভার উন্নয়নে ৪৫টি অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্পের তালিকা তৈরি করে গত ১৭ সেপ্টেম্বর আবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে পৌর এলাকার সড়ক যোগাযোগ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। তিনি জানান, প্রকল্পগুলোর অনুমোদন ও বাস্তবায়নের পরবর্তী কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
উল্লেখ্য, কালীগঞ্জ পৌরসভা ১৯৯০ সালের ১৪ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০১০ সালের ৬ এপ্রিল এটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত হয়। দীর্ঘদিনের নাগরিক সমস্যা সমাধানে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছেন পৌরবাসী।