বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় একটি কলেজের পরিচালনা কমিটি এবং প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার সকালে এক পক্ষের আয়োজিত মানববন্ধনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাগ্‌বিতণ্ডা এবং পরবর্তীতে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হলে উভয় পক্ষের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে সড়কে অবস্থান নেন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলার সোনারায় ইউনিয়ন পরিষদের সামনে এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি ঘটে। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোনারায় ইউনিয়নের তছলিম উদ্দিন তরফদার ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা কমিটি গঠন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ এবং শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় এই কলেজ থেকে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের কেউই পাস করতে পারেননি। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর কলেজের শিক্ষার পরিবেশ এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।

এই উত্তেজনার মধ্যেই সোনারায় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রাজা মণ্ডলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে মঙ্গলবার সকালে এক মানববন্ধনের আয়োজন করেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুর অনুসারীরা।

আয়োজকদের অভিযোগ, মানববন্ধনে বক্তব্য চলাকালীন বর্তমান সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টনের অনুসারীরা সেখানে এসে ব্যানার ও ফেস্টুন কেড়ে নেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে কথাকাটাকাটি হয় এবং দ্রুতই তা ধাক্কাধাক্কি ও হট্টগোলে রূপ নেয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে সড়কে জড়ো হয়ে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি করেন। পুলিশ এসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পর, সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টনের অনুসারীরা মানববন্ধনে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে পাল্টা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

কলেজটির কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবকের অভিযোগ, পরিচালনা কমিটি নিয়ে বিরোধ এবং শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলির কারণে নিয়মিত পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাদের দাবি, নিয়মিত ক্লাস না নিয়ে কিছু শিক্ষক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং দলীয় বিরোধ মেটাতে সময় ব্যয় করছেন। কেউ কেউ হাজিরা দিয়ে বাজারে আড্ডা দেন। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে অভিভাবকদের হয়রানি ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম বলেন, “পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ নিয়োগ ও পরিচালনা কমিটির অনিয়মের সঙ্গে তাকে জড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তাতে রাজি না হওয়ায় তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।”

আমিনুল ইসলামের আরও অভিযোগ, নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের সময় তাকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট পরিবারের একজনকে অবৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের কোনো সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি। একটি চিঠির মাধ্যমে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানান সাবেক এই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ।

এদিকে, মানববন্ধনে ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রাজা মণ্ডলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সেবা প্রদানের বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। বক্তাদের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বিভিন্ন সনদ ও নিবন্ধন নিতে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়।

মানববন্ধনে বক্তব্য প্রদান করেন সোনারায় ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল হালিম। তিনি বলেন, “নির্বাচনি প্রচারে মানুষের কাছে গেলে ইউনিয়ন পরিষদের সেবা নিয়ে নানা অভিযোগ শোনা যায়। সনদ ও নিবন্ধন নিতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়।” এছাড়া স্থানীয় বিএনপির অনেক নেতাকর্মী বর্তমান সংসদ সদস্যের কাছ থেকে যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না বলেও দাবি করেন আব্দুল হালিম।

এই অভিযোগগুলোর বিষয়ে রাজা মণ্ডল বলেন, “কলেজের পরীক্ষার্থীরা কেউ পাস না করায় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে তারা মানববন্ধন করেছিলেন। পরে কলেজের গভর্নিং বডির সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে মঙ্গলবার তারা অবস্থান নেন।”

ইউনিয়ন পরিষদে সেবা দিতে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে রাজা মণ্ডল বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। পরিষদে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও হিসাব সহকারী রয়েছেন, তাদের সঙ্গে কথা বললে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। অভিযোগের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

গাবতলী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিব হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এক পক্ষ মানববন্ধন করতে গেলে অন্য পক্ষ বাধা দেয়। এ নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।”

এই ঘটনায় বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক এমপি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালু এবং বগুড়া-৭ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।