রাজধানী ঢাকায় তিন সদস্যের একটি পরিবারের জন্য পুষ্টিমান বজায় রেখে জীবনযাপন করতে হলে প্রতিদিন কমপক্ষে এক হাজার টাকা কেবল খাবারের পেছনে ব্যয় করতে হয়। এর সঙ্গে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং পোশাকের আনুষঙ্গিক খরচ যুক্ত করলে দৈনিক গড় ব্যয় দুই হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। সেই হিসেবে মাসে মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৬০ হাজার টাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক ড. আবু ইমরান মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে সংসার খরচের এই হিসাব প্রদান করেছেন।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, ড. আবু ইমরানের দেওয়া এই হিসাবের সঙ্গে বাস্তব জীবনের যথেষ্ট মিল রয়েছে। অধিকাংশ মানুষেরই অভিযোগ, তাদের উপার্জনের সিংহভাগই ব্যয় হয়ে যায় বাসা ভাড়া, সন্তানের দুধ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার পেছনে। মাসের শুরুর দিকে কোনোমতে খরচ সামলালেও শেষ দিকে পরিবার নিয়ে টিকে থাকাই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ।
বনশ্রীর বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম (৩৬) একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের খাদ্য বিপণন কর্মকর্তা। তার পরিবারে সদস্য তিনজন, তবে তিনি তার মা-বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে যৌথ পরিবারে বসবাস করেন। ইব্রাহিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সবজির ভরা মৌসুম হলেও বেগুন, মূলা, টমেটো, শসা প্রতিটির দামই চড়া। ঘরে দেড় বছরের বাচ্চার জন্য বাধ্য হয়ে অল্প ফল কিনতে হলেও নিজেদের জন্য কেনার মতো অবস্থা নেই। বাসা ভাড়া দিয়ে নিত্যদিনের জিনিসপত্র কিনতেই মাসের ১০ তারিখের আগে বেতন শেষ। প্রায় প্রতি মাসেই বাবা কিংবা ভাইয়ের কাছে ঋণ নিয়ে চলতে হয়। এই বাজারে পুষ্টির চিন্তা আর সঞ্চয় এখন আমাদের মতো মধ্যবিত্তের জন্য দুরূহ ব্যাপার।”
একই রকম কষ্টের কথা জানান মেরাদিয়া বাজারের ফল বিক্রেতা মো. বিল্লাল হোসেন। ফল বিক্রি করলেও নিজের পরিবারের পাতে পুষ্টিকর খাবার জোটে না তার। মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, “২০ হাজার টাকা বেতনের মধ্যে ৮ হাজার টাকাই চলে যায় ঘর ভাড়ায়। বিদ্যুৎ, গ্যাস, তিনজনের খাবার ও ছেলের স্কুলের বেতন মেটাতে টানাটানি লেগে যায়। মাসে এক দিন গরুর মাংস আর দু-চারদিন মাছ খাওয়াও এখন আমাদের জন্য কঠিন। কম দামের সবজি আর ডিমই একমাত্র ভরসা।”
খাবারে কত খরচ, বাজারে কত দাম
পুষ্টিবিদদের মতে, একজন মানুষের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ শর্করা, ১৫ শতাংশ প্রোটিন এবং ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ স্নেহজাতীয় খাবার থাকা আবশ্যক। এই সুষম উপাদানের ঘাটতি মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
দেশের অধিকাংশ মানুষ শর্করার জন্য ভাতের ওপর নির্ভরশীল। কেউ কেউ রুটি বা পরোটা থেকেও শর্করা গ্রহণ করেন। কিছু সবজি বা ডালজাতীয় খাবার থেকে প্রোটিন পাওয়া গেলেও, প্রোটিনের প্রধান উৎস হিসেবে মানুষ মূলত মাছ বা মাংসের ওপর নির্ভর করে। আর ঘি, মাখন, পনির ও মাংসের চর্বি থেকে স্নেহ মেলে।
সম্প্রতি রাজধানীর একাধিক বাজারে সরেজমিনে দেখা গেছে, গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৮০০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৯০ থেকে ২১০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩৪০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং লেয়ার মুরগির কেজি ৩৬০ থেকে ৩৭০ টাকা। অন্যদিকে দেশি মুরগির কেজি ৭৩০ থেকে ৭৫০ টাকা। চালের মধ্যে মোটা চাল খোলাবাজারে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি। মাঝারি মানের চাল (পাইজাম, লতা) ৫৬ থেকে ৬৫ টাকা এবং সরু চাল মিনিকেট ও নাজিরশাইল কেজি প্রতি ৭০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এই বাজারদরের প্রেক্ষিতে একটি পরিবারের সম্ভাব্য খরচ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আবু ইমরান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী তিনজনের একটি পরিবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টিমান নিশ্চিত করে খাবার খেতে হলে প্রতিদিন কমপক্ষে এক হাজার টাকা ব্যয় করতে হবে। খাদ্যের সঙ্গে শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও পোশাকের খরচ বিবেচনায় নিলে এই খরচ প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়।”
মাসে ৬০ হাজার টাকা আয় ছাড়া রাজধানীতে জীবনযাপন কি অসম্ভব? এই প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বাংলাদেশের মানুষজন স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত সহনশীল। কোনো না কোনোভাবে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করেন তারা।”
নারী ও শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) পুষ্টিবিদ ড. মো. মুনিরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বর্তমান বাজারে অনেক কিছুই মানুষ কিনতে পারছে না, এটা খুবই স্বাভাবিক। শাকসবজি কম খাচ্ছে, মাছ-মাংস হয়তো কম কিনছে, এতে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব পড়ছে। এই অপুষ্টির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা। তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে।”
এই গবেষক আরও বলেন, “গর্ভধারণকারী বা প্রজননক্ষম নারী অপুষ্টির শিকার হলে তার প্রভাব সরাসরি সন্তানের ওপর পড়ে। এতে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টিতে ভোগার প্রবণতা তৈরি হয় এবং নানা রোগের প্রকোপ বাড়ে। ওজন কমতে থাকে, আর শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ও উচ্চতা বাধাগ্রস্ত হয়।”
অপুষ্টির শিকার ৮ শতাংশ মানুষ
রামপুরার উলন সড়কের বাসিন্দা মর্জিনা বেগম দুই বাসায় কাজ করে ১০ হাজার টাকা পান। তার বৃদ্ধ স্বামী প্রতিদিন কাজ করতে পারেন না। মাসে সব মিলিয়ে তাদের আয় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। দুই মেয়ের একজনকে বিয়ে দিয়েছেন, অন্যজন তার সঙ্গে থাকেন। মর্জিনা আক্ষেপ করে বলেন, “মাসে দুই-একবার মাছ কিনলেও পাতে মাংস জোটে না। ঠিকমতো পেট পুরে খেতে পারি না, পুষ্টির চিন্তা করে আমাদের কী হবে বাবা?”
চলতি বছর প্রকাশিত গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ চরম অপুষ্টির শিকার। একই সূচকে শিশুদের তীব্র অপুষ্টির হার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। উচ্চতার তুলনায় কম ওজন তীব্র অপুষ্টির অন্যতম লক্ষণ, যা শিশুদের অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে ৩ শতাংশ অপুষ্টির কারণে মারা যাচ্ছে।
আইসিডিডিআর,বির ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ৫০ শতাংশ মা অপুষ্টিতে ভোগেন। এর ফলে গর্ভের শিশু কম ওজন নিয়ে ভূমিষ্ঠ হওয়ার আশঙ্কা দ্বিগুণ হয়ে যায়। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (বিডিএইচএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সি ২৪ শতাংশ শিশুর উচ্চতা কম। অর্থাৎ প্রতি চারটি শিশুর মধ্যে একটির উচ্চতা বয়সের তুলনায় কম। এছাড়া ১৩ শতাংশ শিশু রোগাক্রান্ত, ৫৩ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারী রক্তস্বল্পতায় ভোগেন এবং প্রজননক্ষম বয়সি ৫৬ শতাংশ নারী স্থূলকায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সায়েদুর আরেফিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করার অর্থই হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দক্ষ ও সুনাগরিক গড়ে তোলা। তবে সুনাগরিক বলতে কেবল শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বোঝায় না। এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে কর্মক্ষমতা ও মেধা। যদি মানুষের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা না থাকে, তবে তারা শ্রম দিতে পারবে না, দেশকে এগিয়ে নিতে পারবে না।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের খাদ্যাভ্যাসে প্রোটিন বা আমিষসমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ বরাবরই কম ছিল। বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে সেই সীমাবদ্ধতা আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা কেবল সামনের দিনগুলোই বলতে পারবে। আজ আমরা পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছি না, আর এই ঘাটতি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।”
গত ৩ আগস্ট রাজধানীর একটি হোটেলে সরকারের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় পুষ্টি অন্তর্ভুক্তিকরণ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব নিয়ে এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে ব্র্যাকের ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ডের সচিবালয়প্রধান সায়কা সিরাজ বলেন, “স্বাস্থ্যসেবার জন্য মানুষ নানা স্তরে হাসপাতালে গেলেও পুষ্টির জন্য কোথাও যায় না। পরিবার ও পুষ্টিসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।”