রাজধানীর মিরপুর-১৪ নম্বর এলাকা থেকে গত শনিবার বিকেলে বাসে করে কারওয়ান বাজার এলাকায় আসেন শিহাব উদ্দিন। তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রার মূল উদ্দেশ্য ছিল কারওয়ান বাজারে অবস্থিত বাটার একটি বিশেষ বিক্রয়কেন্দ্র থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো মানের জুতা সংগ্রহ করা। তবে প্রশ্ন জাগতেই পারে, মিরপুর থেকে এত দূরে কারওয়ান বাজারে জুতা কিনতে কেন আসলেন তিনি?
শিহাব বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ মেটান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর এক জোড়া নতুন জুতা প্রয়োজন ছিল, কিন্তু বাজেটে টান থাকায় তিনি খুব বেশি দামি জুতা কিনতে পারছিলেন না। এক বন্ধুর কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন যে, কারওয়ান বাজারে মেট্রো স্টেশনের পাশে বাটার একটি শোরুম রয়েছে যেখানে সারা বছরই বিশেষ ছাড়ে জুতা বিক্রি করা হয়। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই তিনি এখানে ছুটে আসেন।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কষ্টটুকু শিহাবের জন্য বৃথা যায়নি। মাত্র ৬০০ টাকায় এক জোড়া জুতা কিনতে সক্ষম হন তিনি। জুতা কিনে ফেরার পথে শিহাব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে এসে আমার খুবই উপকার হলো। এই জুতা অন্য শোরুম থেকে কিনলে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার টাকা লাগত। প্রায় ৬০ শতাংশ ছাড়ে কিনতে পেরেছি।
শিহাবের মতো আরও অনেক মানুষ কম দামে মানসম্মত জুতা কিনতে এই শোরুমে ভিড় করেন। কারওয়ান বাজারে বিএসইসি ভবন এবং মেট্রো স্টেশনের পাশেই অবস্থিত এই বাটার শোরুমটি। বিক্রয়কেন্দ্রটিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বিভিন্ন ধরনের জুতার প্রকৃত মূল্যের ওপর ৫০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত আকর্ষণীয় মূল্যছাড় দেওয়া হচ্ছে।
কারা কেনেন এই জুতা
শোরুমটিতে জুতার দাম যাচাই করার সময় কথা হয় হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি সাভারে বসবাসকারী একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। গত শনিবার ছুটির দিনে প্রয়োজনীয় কাজে কারওয়ান বাজার এলাকায় এসেছিলেন তিনি। কাজ শেষ করে ফেরার পথে এই শোরুমে ঢুঁ মারেন তিনি।
কেন এখানে আসেন, তা জানতে চাইলে হাফিজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমার চাকরির শুরুর দিকে যখন বেতন কম ছিল, তখন থেকে এখানে আসি। এটা তো বাটার জুতাই। কাজ চলে যায়। বাইরের নন-ব্র্যান্ড জুতার চেয়ে এটি তুলনামূলক ভালো। তবে সব সময় আমার পায়ের সাইজের জুতা পাওয়া যায় না। এ জন্য মাঝেমধ্যেই এখানে আসি।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘বিশেষ করে যাঁরা নতুন চাকরি শুরু করেছেন, (যাঁদের আয় কম) ও শিক্ষার্থীদের ফরমাল জুতার প্রয়োজন হয়, তাঁদের জন্য এটি খুব ভালো একটি জায়গা।’
আরেকজন ক্রেতা জাকির হোসেন, যিনি কারওয়ান বাজারের একটি পাঁচতারকা হোটেলে কর্মরত, ৮০০ টাকায় একটি শু কিনেছেন যার প্রকৃত মূল্য ছিল ১ হাজার ৯৯৯ টাকা। জাকির হোসেন বলেন, ‘এ নিয়ে চারবার আমি এ শোরুম থেকে জুতা কিনেছি। নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জন্যও এখান থেকে জুতা কিনেছি।’
এখান থেকে কেনা জুতার স্থায়িত্ব ও মান সম্পর্কে জানতে চাইলে জাকির হোসেন বলেন, ‘একটু উনিশ-বিশ হতে পারে। তবে মান ভালোই বলা যায়। অনেক দিন ধরে এখান থেকে কেনা জুতা ব্যবহার করছি।’
শোরুমের কর্মীদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাগত শ্রেণির মানুষ এখানে কেনাকাটা করতে আসেন। তবে অফিসগামী ব্যক্তিদের আনাগোনা এখানে সবচেয়ে বেশি।
দাম কতটা কম
বাটার এই শোরুমটি ঘুরে দেখা যায়, এখানে চামড়ার তৈরি শু, জুতা, স্যান্ডেল ও স্পঞ্জ স্যান্ডেল পাওয়া যায়। পাশাপাশি কৃত্রিম চামড়ার তৈরি কেডস ও জুতাও বিক্রির জন্য রয়েছে। শোরুম কর্তৃপক্ষ জানায়, এখান থেকে বছরে প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ জোড়া জুতা বিক্রি হয়।
এখানে বিভিন্ন ধরনের জুতার প্রকৃত মূল্যের ওপর সারা বছরই ৫০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দেওয়া হয়। ছাড়কৃত মূল্যে চামড়ার জুতা ও শুয়ের দাম সর্বনিম্ন ২৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে অধিকাংশ জুতা ২৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যায়। অন্যদিকে কেডস ও শু বিক্রি হয় ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায়।
শোরুমের একটি বড় অংশে রাখা হয়েছে ছেলেমেয়েদের স্কুল জুতা। এসব জুতার প্রকৃত দাম ৮৯৯ থেকে ৯৯৯ টাকা হলেও ছাড়কৃত মূল্যে তা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া কারখানার শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় সেফটি শু ২ হাজার ২০০ টাকার পরিবর্তে মাত্র ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শোরুমে হাস পাপিসের শু এবং নর্থস্টারের স্নিকারও দেখা গেছে, যার মধ্যে হাস পাপিসের ছাড়কৃত মূল্য ২ হাজার টাকা এবং নর্থস্টারের দাম ৭০০ টাকা। এছাড়া বাটার ঐতিহ্যবাহী চামড়ার জুতা ও ফ্লোর স্যান্ডেল পাওয়া যাচ্ছে ৩০০ টাকায় এবং স্পঞ্জ স্যান্ডেলের দাম রাখা হয়েছে মাত্র ৪৫ টাকা।
তবে সব ক্রেতা এই বিশাল ছাড়ে সন্তুষ্ট নন, কেউ কেউ সংশয়েও থাকেন। গত শনিবার সন্ধ্যায় সানজিদা আক্তার নামের এক ক্রেতা শোরুমটি ঘুরে দেখার পর জুতা না কিনেই ফিরে যান। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম না যে এখানে এত ছাড়ে জুতা বিক্রি হয়। তবে এসে দেখলাম অনেক কম দাম। কিন্তু বেশ কিছু জুতার মান কমে গিয়েছে বলে মনে হয়েছে। টাকা খরচ করে কিনলে ভালো হবে কি না মনে এই সন্দেহ থাকায় শেষমেষ জুতা না কিনেই ফিরছিলাম।’
কেন এই মূল্যছাড়
বাটার শোরুমের একজন কর্মী এই বিশেষ ছাড়ের রহস্য ব্যাখ্যা করে জানান, বাটার কারখানায় জুতা উৎপাদনের পর প্রতিটি জোড়ার মান যাচাই করা হয়। মান যাচাই বা কিউসি (QC) প্রক্রিয়ায় যেসব জুতা সামান্য ত্রুটির কারণে আটকে যায়, সেগুলোর মধ্যে তুলনামূলক ভালো মানের জুতাগুলো এই শোরুমে ছাড়কৃত মূল্যে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়।
ওই কর্মী আরও জানান, ‘আপনি সাধারণ চোখে জুতা তৈরির এই ভুল হয়তো ধরতে পারবেন না। মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ জুতার মতোই অনেকটা টেকসই হয়। তবে কোনো জুতায় খুব বড় ত্রুটি থাকলে সেটি এখানেও বিক্রির জন্য আনা হয় না।’
জানা গেছে, পুরো রাজধানীতে বাটার এমন মূল্যছাড়ের দোকান মাত্র একটি। এর বাইরে টঙ্গীতে বাটার কারখানার সামনে আরও একটি অনুরূপ শোরুম রয়েছে। কারওয়ান বাজারের এই বিক্রয়কেন্দ্রটি প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে এবং প্রতি মঙ্গলবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে।