বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার নাগরিকদের তাদের বাড়িতে কয়েক দিনের খাবার, পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চলাইট এবং রেডিও মজুত রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। এই নির্দেশনার আওতায় যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নাগরিকদের তিন দিনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, সুইডেন ও নরওয়েতে এক সপ্তাহ এবং জার্মানিতে ১০ দিনের প্রস্তুতির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এসব সরকারি নির্দেশনা সামনে আসায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে সরকারের এই আহ্বানের পর বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে টিনজাত খাবার, রেডিও, টর্চলাইট ও পাওয়ার ব্যাংকের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, কেন হঠাৎ এতগুলো দেশ নাগরিকদের জরুরি সামগ্রী প্রস্তুত রাখতে বলছে? এর পেছনে কি কোনো আসন্ন যুদ্ধ কিংবা বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা কাজ করছে?

বিভিন্ন দেশের সরকারি নির্দেশনা এবং বিবিসি, নিউজউইক, স্কাই নিউজ ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই প্রস্তুতির পেছনে একাধিক ঝুঁকি বিদ্যমান। এর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চরম আবহাওয়া, সাইবার হামলা এবং বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগব্যবস্থা সাময়িকভাবে অচল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। ইউরোপের কিছু দেশের প্রস্তুতির তালিকায় যুদ্ধ এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকেও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে এসব নির্দেশনা থেকে নির্দিষ্ট কোনো যুদ্ধ বা বিপর্যয় যে আসন্ন, তেমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ভিত্তি নেই।

গত ২২ অক্টোবর যুক্তরাজ্য সরকার ‘বি রেডি’ নামের একটি বিশেষ প্রচারাভিযান শুরু করে। এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলো, জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকেরা যেন অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন নিজেদের মৌলিক প্রয়োজনগুলো নিজেরাই মেটাতে পারে। ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশনায় একজনের জন্য প্রতিদিন তিন লিটার খাবার পানি, সহজে নষ্ট হয় না এমন খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক এবং ব্যাটারিচালিত বা হাতল ঘুরিয়ে চালানো যায় এমন রেডিও রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, ঝড়, বন্যা, বিদ্যুৎবিভ্রাট কিংবা সাইবার হামলার কারণে জরুরি পরিষেবা সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারগুলো যদি কিছুদিন নিজেদের সামলাতে পারে, তবে উদ্ধার ও সহায়তাকারী সংস্থাগুলো অধিকতর বিপদে থাকা মানুষদের আগে সাহায্য করার সুযোগ পাবে। সরকারের এই আহ্বানের পর যুক্তরাজ্যের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানে জরুরি সামগ্রীর বিক্রি বেড়েছে।

বিবিসির ‘নিউজ নাইট’ অনুষ্ঠানের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, সুপারমার্কেট চেইন আইসল্যান্ডে এক সপ্তাহান্তে টিনজাত খাবারের বিক্রি ৪০ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বোতলজাত পানির বিক্রিও বৃদ্ধি পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের গৃহস্থালির ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান রবার্ট ডায়াস জানিয়েছে, আগের সপ্তাহের তুলনায় তাদের রেডিওর বিক্রি ১৬০ শতাংশ বেড়েছে। ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ম্যাপলিনের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি ঘোষণার পর রেডিওর বিক্রি ৯২ শতাংশ, টর্চলাইটের বিক্রি ২৮৪ শতাংশ এবং পাওয়ার ব্যাংকের বিক্রি ১০৬ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আগের মাসের একই সময়ের সঙ্গে এই পরিসংখ্যানের তুলনা করেছে। জরুরি পরিস্থিতির সরঞ্জাম বিক্রি করে এমন আরও কিছু ছোট প্রতিষ্ঠান চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে।

তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এই পরিসংখ্যানগুলো নির্দিষ্ট কয়েকটি বিক্রেতার। এর মাধ্যমে গোটা যুক্তরাজ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বা খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। সুপারমার্কেট চেইন আইসল্যান্ড নিশ্চিত করেছে যে, তাদের টিনজাত খাবারসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।

২৮ অক্টোবর প্রকাশিত নিউজউইকের এক প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের জরুরি প্রস্তুতিবিষয়ক নির্দেশনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের পাশাপাশি কানাডা, জাপান, মেক্সিকো ও নেদারল্যান্ডসেও তিন দিনের জরুরি সামগ্রী রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সুইডেন ও নরওয়েতে প্রায় এক সপ্তাহ এবং জার্মানিতে ১০ দিনের প্রস্তুতির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভারতে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখতে বললেও সবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ওয়েবসাইট ‘রেডি ডট গভ’-এও কয়েক দিন চলার মতো খাবার, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখার নির্দেশনা দেওয়া আছে।

তবে সব দেশের নির্দেশনার কারণ এক নয়। জাপানের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে স্থানীয় জরুরি পরিস্থিতির জন্য আলাদা নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়া এসব নির্দেশনার সবকটিই নতুন নয়; অনেক দেশে দীর্ঘদিন ধরে দুর্যোগ প্রস্তুতির কর্মসূচি চালু আছে।

ইউরোপীয় কমিশন ২০২৫ সালের মার্চে ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ ঘোষণা করে। এতে সদস্যদেশগুলোর নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশন বলেছে, “ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘাত, সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা মোকাবিলায় সামগ্রিক প্রস্তুতি প্রয়োজন।”

সুইডেনের সরকারি নির্দেশিকায় সংকটের পাশাপাশি যুদ্ধের পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ আছে। দেশটির নাগরিকদের এক সপ্তাহ চলার মতো খাবার, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। তবে সুইডেনে যুদ্ধকালীন নাগরিক প্রস্তুতির নির্দেশনা নতুন কিছু নয়; দেশটির এমন নির্দেশিকা প্রকাশের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সাম্প্রতিক সংস্করণে পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক স্থাপনাগুলোর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে আলাদা উদ্যোগ নিয়েছে। ২ নভেম্বর দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ‘ফোর্ট্রেস আমেরিকা’ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, বাইরে থেকে সহায়তা না পেলেও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলো যেন অন্তত ৯০ দিন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। এ জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানির স্বনির্ভরতা, সরবরাহব্যবস্থা, জরুরি মজুত এবং সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই ৯০ দিনের প্রস্তুতি সাধারণ নাগরিকদের জন্য নয়, বরং এটি সামরিক স্থাপনাগুলোর কার্যক্রম সচল রাখার একটি পরিকল্পনা।

বিশ্লেষকদের মতে, বিভিন্ন দেশের প্রস্তুতির উদ্যোগকে একই ধরনের আসন্ন হুমকির সতর্কবার্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আধুনিক জীবনে বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট, ব্যাংকিং ও যোগাযোগব্যবস্থা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বড় ধরনের দুর্যোগ বা সাইবার হামলায় একটি পরিষেবা বন্ধ হলে অন্য পরিষেবাও ব্যাহত হতে পারে। সরকারি নির্দেশনাগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো এমন পরিস্থিতিতে মানুষের দুর্ভোগ কমানো।

ব্রিটিশ সরকার স্পষ্ট করেছে, জরুরি প্রস্তুতি মানে একবারে বিপুল পরিমাণ খাবার বা পানি কিনে রাখা নয়। ঘরে আগে থেকেই থাকা সামগ্রী দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে কিছু জিনিস যোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকারের নির্দেশনায় প্রতিবেশীদের খোঁজ রাখা, জরুরি যোগাযোগের নম্বর লিখে রাখা এবং যাঁদের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন, তাঁদের কথা বিবেচনা করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, বিভিন্ন দেশের এই উদ্যোগের মূল বার্তা হলো সম্ভাব্য সংকটের জন্য আগে থেকে প্রস্তুত থাকা; এটি আসন্ন যুদ্ধ বা খাদ্যসংকটের কোনো নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।