গ্রীষ্মের তীব্র গরমে যখন বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ-চালিত পাখার ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন দেশে ৫ হাজার ২১২ মেগাওয়াট বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। বিশেষ করে রাত ৯টার দিকে এই চাহিদার চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। তবে সাধারণ ফ্যানের পরিবর্তে কম বিদ্যুৎ খরচকারী বিএলডিসি (ব্রাশলেস ডাইরেক্ট কারেন্ট) ফ্যান ব্যবহার করা হলে এই চাহিদাকে ২ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।

ইনস্টিটিউট ফর অ্যানার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো উঠে এসেছে। আজ সোমবার প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দেশের ২৬টি জেলার মোট ৪৩৫টি পরিবারকে তাদের মাসিক আয়ের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে জরিপ চালানোর পর এই গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

‘হাউসহোল্ড স্পেস কুলিং ইন বাংলাদেশ: রোল অব এনার্জি-এফিশিয়েন্ট ফ্যানস’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি লিখেছেন আইইইএফএর বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানিবিশ্লেষক শফিকুল আলম। এই গবেষণায় বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যান ব্যবহারের সুফলগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত মোট ফ্যানের মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ হলো বিএলডিসি ফ্যান। এই ধরনের ফ্যান চালাতে মাত্র ৩৫ ওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়, যেখানে একটি সাধারণ ফ্যান চালাতে ৭০ ওয়াট বা তারও বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “বাংলাদেশে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় আবাসিক খাতে।” এই খাতের মধ্যে ফ্যান এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসির ব্যবহার বিদ্যুৎ খরচের প্রধান কারণ। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোও গ্রীষ্মকালে গড়ে দুটি পর্যন্ত ফ্যান ব্যবহার করে, যা সামগ্রিক বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদাকে বাড়িয়ে দেয়। আর এই বিপুল চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারার কারণে অনেক সময় ৩ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হয়। যদি সাধারণ ফ্যানের বদলে বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহৃত হয়, তবে গ্রীষ্মকালীন বিদ্যুতের চাহিদা কমার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ এড়ানো সম্ভব হবে। এই সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করে দেশে বর্তমানে ব্যবহৃত উচ্চ বিদ্যুৎ খরচকারী সব ফ্যান বদলে ফেলা সম্ভব।

সার্বিক বিষয়ে শফিকুল আলম বলেন, “বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) জন্য চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যানের ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদা কমবে। এতে পিডিবির ওপর চাপও কমবে। তবে বিদ্যুৎ বিল কমানোর আগ্রহ থাকলেও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যান সম্পর্কে মানুষের ধারণা কম।”

জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী ৭৫ শতাংশ পরিবারই বাজারে এই ধরনের ফ্যান পাওয়া যায় কি না, সে সম্পর্কে অবগত নয়।

বছরে ৮ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহার করলে বছরে সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৯১৩ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব। এর আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা (৭৩ কোটি মার্কিন ডলার)। এই ফ্যানগুলো ব্যবহারের ফলে কতটা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়, তা জানার পর জরিপে অংশ নেওয়া ৯৬ শতাংশ পরিবার বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে উচ্চমূল্যের কারণে অনেক পরিবারের পক্ষে এই ফ্যান কেনা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি সাধারণ ফ্যানের দাম যেখানে প্রায় ২ হাজার টাকা (১৬ দশমিক ৩ মার্কিন ডলার), সেখানে বিএলডিসি ফ্যানের দাম ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা (৪০ দশমিক ৭ থেকে ৫১ দশমিক ৩ মার্কিন ডলার)।

দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ২৫ হাজার টাকা বা তার কম। গ্রীষ্মকালে এই পরিবারগুলোর গড় মাসিক বিদ্যুৎ বিল হয় ৬৬৩ টাকা। কোনো আর্থিক সহায়তা না পেলে, বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের মাধ্যমে বিএলডিসি ফ্যান কেনার বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে এই পরিবারগুলোর ৭ দশমিক ৭ থেকে ৯ দশমিক ৬ বছর সময় লাগবে। তবে যদি বড় পরিসরে একসঙ্গে ফ্যান কেনা হয় এবং কার্বন ক্রেডিট বিক্রির অর্থ কাজে লাগানো যায়, তবে এই সময় কমে ৪ দশমিক ৮ বছরে নেমে আসতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যানের ব্যবহার বাড়াতে সরকারকে একটি পরিকল্পিত কর্মসূচি নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে।

সাতটি সুপারিশ

প্রতিবেদনে মোট সাতটি সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যানের ব্যবহার বাড়াতে একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যান এবং এর মাধ্যমে কীভাবে বিদ্যুৎ বিল কমানো যায়, সে বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা প্রয়োজন। ক্রেতারা যাতে সহজেই এই ফ্যানগুলো চিনতে পারেন, সেজন্য ফ্যানের মান নির্ধারণ এবং লেবেল-সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন করলে সুফল পাওয়া যাবে। এছাড়া স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য বিএলডিসি ফ্যানের দাম কমাতে হবে এবং কিস্তিতে দাম পরিশোধের সুযোগ রেখে তা বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।