বলিউডের বাদশা হিসেবে পরিচিতি পেলেও শুরুর দিকে শাহরুখ খানের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। দিল্লির এক তরুণের স্বপ্ন ছিল ভারতের হয়ে হকি খেলার। দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নেমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁর। তখন বলিউডের রুপালি পর্দা তাঁর স্বপ্নের গন্তব্য হয়ে ওঠেনি।
তবে জীবনের চিত্রনাট্য বোধ হয় কোনো পরিচালকও আগে থেকে লিখে রাখতে পারেন না। শাহরুখ খানের ক্ষেত্রেও ঠিক তা-ই ঘটেছে। হকি খেলার স্বপ্ন দেখতে দেখতে তিনি একদিন হয়ে উঠলেন বলিউডের সুপারস্টার। আর যে মানুষটি একসময় ভারতের হয়ে খেলতে চেয়েছিলেন, তিনি এখন ক্রিকেটের একাধিক দলের মালিক!
আজ শাহরুখ খানের জন্মদিন। অভিনয়, সিনেমা, প্রেম, রোমান্স এবং সংলাপ—সব মিলিয়ে তাঁর পরিচয়ের শেষ নেই। তবে পর্দার বাইরের শাহরুখের আরেকটি পরিচয় আছে, যেটি ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। তিনি একসময় পেশাদার খেলোয়াড় হতে চেয়েছিলেন। হকি, ফুটবল ও ক্রিকেট—সবই তাঁকে টানত। তবে হকির প্রতি ভালোবাসা ছিল একটু বেশিই।
দিল্লিতে বেড়ে ওঠা শাহরুখ তাঁর স্কুল ও কলেজজীবনে নিয়মিত খেলাধুলা করতেন। হকিতে তিনি খেলতেন সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে। স্বপ্ন ছিল ভারতের হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার। অর্থাৎ আজ যে মানুষটিকে ক্রিকেটের গ্যালারিতে দলকে সমর্থন দিতে দেখা যায়, একসময় তিনিই স্বপ্ন দেখতেন দেশের হয়ে মাঠে নামার।
কিন্তু ভাগ্য তখন অন্য চিত্রনাট্য লিখছিল। পিঠের গুরুতর চোট সব হিসাব পাল্টে দিল। বাধ্য হয়ে খেলাধুলা থেকে সরে যেতে হলো তাঁকে। এমনকি একটা সময় তিনি শয্যাশায়ীও ছিলেন। খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্নটা যেন সেখানেই থেমে গেল। এরপর মায়ের উৎসাহে শাহরুখ থিয়েটারে যুক্ত হন এবং অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। টেলিভিশন হয়ে একসময় প্রবেশ করেন সিনেমার জগতে। তারপরের গল্পটা তো সবারই জানা। দিল্লির সেই তরুণ হয়ে ওঠেন বলিউডের ও বিশ্বের অন্যতম বড় তারকা। তবে হকির সঙ্গে সম্পর্কটা একেবারে ছিন্ন হয়নি। ২০০৭ সালে মুক্তি পায় শাহরুখের অভিনীত সিনেমা ‘চাক দে! ইন্ডিয়া’।
পরিচালক শিমিত আমিনের এই স্পোর্টস ড্রামায় শাহরুখ অভিনয় করেন কবির খান চরিত্রে। ভারতের পুরুষ হকি দলের সাবেক অধিনায়ক কবির খানের দায়িত্ব পড়ে জাতীয় নারী হকি দলের কোচের। সিনেমাটিতে উঠে আসে ভারতীয় হকির নানা বাস্তবতা। নারী খেলোয়াড়দের চ্যালেঞ্জ, দলীয় সংহতি, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করার চাপ—সবকিছুই এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কবির খান চরিত্রে শাহরুখের অভিনয় তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স হয়ে আছে। সিনেমাটি ভারতে নারী হকির প্রতিও নতুন করে মনোযোগ তৈরি করেছিল।
মজার ব্যাপার হলো, হকি নিয়ে শাহরুখের এই আবেগ শুধু সিনেমার পর্দায় আটকে থাকেনি। ২০১৮ সালে ভুবনেশ্বরে পুরুষ হকি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন তিনি। সেখানে নিজের স্কুল ও কলেজজীবনে হকি খেলার অভিজ্ঞতার কথাও বলেছিলেন। যে স্বপ্ন একদিন চোটের কারণে থেমে গিয়েছিল, সেই খেলার সঙ্গেই আবার দেখা হলো সিনেমার পর্দায়। তবে এবার তাঁর হাতে ছিল হকি স্টিক নয়, বরং পরিচালকের দেওয়া চরিত্র।
খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও খেলার দুনিয়া থেকে দূরে থাকতে পারেননি শাহরুখ। ২০০৮ সালে জুহি চাওলা ও জয় মেহতার সঙ্গে মিলে কিনে নেন আইপিএলের অন্যতম আটটি মূল ফ্র্যাঞ্চাইজির একটি—কলকাতা নাইট রাইডার্স বা কেকেআর। শুরুটা অবশ্য খুব মসৃণ ছিল না। মাঠের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতার অভাব ছিল এবং সমালোচনাও কম শুনতে হয়নি। কিন্তু ধীরে ধীরে নিজেদের গুছিয়ে নেয় কলকাতার এই দলটি।
২০১২ সালে চেন্নাই সুপার কিংসকে ফাইনালে হারিয়ে প্রথমবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয় কেকেআর। দুই বছর পর, ২০১৪ সালে কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবকে হারিয়ে জেতে দ্বিতীয় শিরোপা। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা। অবশেষে ২০২৪ সালে সানরাইজার্স হায়দরাবাদকে ফাইনালে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয় শাহরুখের দল। তিনটি শিরোপা; আর এর মাঝখানে ছিল সমালোচনা, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং প্রত্যাবর্তনের গল্প। কেকেআর এখন আইপিএলের সফল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর একটি। শাহরুখের ক্রিকেট-সম্পর্কও পেয়েছে নতুন মাত্রা।
শাহরুখের ক্রিকেট ব্যবসা অবশ্য শুধু আইপিএলেই সীমাবদ্ধ নেই। নাইট রাইডার্স গ্রুপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটেও ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর বিনিয়োগ। ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে রয়েছে ত্রিনবাগো নাইট রাইডার্স। ইন্টারন্যাশনাল লিগ টি-টুয়েন্টিতে রয়েছে আবুধাবি নাইট রাইডার্স। আর যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ ক্রিকেটে রয়েছে লস অ্যাঞ্জেলেস নাইট রাইডার্স।
অর্থাৎ ভারত থেকে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, আবুধাবি হয়ে যুক্তরাষ্ট্র—ক্রিকেটের নতুন নতুন বাজারে হাজির শাহরুখের নাইট রাইডার্স। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক এক ক্রিকেট নেটওয়ার্ক। নাইট রাইডার্স এখন বিশ্ব ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের একটি পরিচিত নাম।
একসময় ভারতের হয়ে হকি খেলার স্বপ্ন দেখতেন যে তরুণ, তিনি এখন একাধিক দেশের টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে দল নামাচ্ছেন। খেলোয়াড় হতে পারেননি, তবে হয়েছেন দলের মালিক। মাঠে গোল করার সুযোগ হয়নি, কিন্তু তাঁর দলের খেলোয়াড়েরা ছক্কা মারলে গ্যালারিতে তাঁকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। জীবন তাঁকে হকির মাঠে ভারতের জার্সি পরার সুযোগ দেয়নি, কিন্তু ক্রিকেটের মাঠে নিজের নামের জার্সি ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।