কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার কামাত আঙ্গারিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ছয় মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বেতন না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে সহকারী শিক্ষক ও কর্মচারীরা মাদ্রাসাটির সুপারিনটেনডেন্ট (সুপার) মো. সাইদুর রহমান এবং অফিস সহকারী শফিয়ার রহমানকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে অবরুদ্ধ করে রাখেন। আজ সোমবার সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে বেলা ৩টা পর্যন্ত মাদ্রাসা কার্যালয়ে তাঁদের আটকে রাখা হয়।
এই ঘটনার এক পর্যায়ে মাদ্রাসার সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন সহকারী শিক্ষক ও কর্মচারীরা। এসময় তাঁরা উচ্চকণ্ঠে ‘ছয় মাস ধরে বেতন নাই, বেতন চাই, বেতন চাই’ বলে স্লোগান দেন।
বিক্ষোভকারী শিক্ষকদের অভিযোগ, মাদ্রাসা সুপারের কারণে সৃষ্ট প্রশাসনিক জটিলতার ফলে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে প্রতিষ্ঠানের মোট ১৮ জন শিক্ষক ও কর্মচারী তাঁদের প্রাপ্য বেতন পাচ্ছেন না। তাঁদের দাবি, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সুপারের বিরুদ্ধে তাঁদের এই আন্দোলন চলবে।
ঘটনা প্রসঙ্গে মাদ্রাসাটির সহকারী শিক্ষক ইমরুল কায়েস মুঠোফোনে বলেন, ‘আমরা শিক্ষক। মানুষ আমাদের কাছে আরও ভদ্র আচরণ প্রত্যাশা করে। কিন্তু পেটের দায়ে সুপার স্যার ও অফিস সহকারীকে অবরুদ্ধ করতে হয়েছে। ছয় মাস ধরে বেতন বন্ধ। আমরা বাজারে যেতে পারি না। আমাদের সংসার কীভাবে চলে? আমরা সুপার স্যারের অধীনে চাকরি করি। তিনি কীভাবে সমস্যার সমাধান করবেন, সেটা তাঁর বিষয়।’
এদিকে খবর পেয়ে মাদ্রাসাটির সভাপতি এবং ভূরুঙ্গামারী উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব প্রভাষক শহিদুল ইসলাম আকন্দ বেলা তিনটার দিকে পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা দুজনকে উদ্ধার করেন এবং পরবর্তীতে বিক্ষুব্ধ শিক্ষক ও কর্মচারীদের সঙ্গে এক বৈঠকে বসেন।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দেড় বছর আগে সুপার সাইদুর রহমান তাঁর চাচাতো ভাই ও অফিস সহকারী শফিয়ার রহমানকে শিক্ষক হিসেবে পদায়ন দেখিয়েছিলেন। এই পদক্ষেপের ফলে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে অফিস সহকারী পদে বহাল থাকার দাবিতে শফিয়ার রহমান আদালতে মামলা করেন। প্রায় এক বছর আগে দায়ের করা সেই মামলাটি এখনো বিচারাধীন। পদবি সংক্রান্ত এই জটিলতা নিষ্পত্তি না হওয়ায় গত ছয় মাস ধরে শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে মাদ্রাসা সুপার সাইদুর রহমান মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অফিস সহকারী শফিয়ার রহমানের পদবি পরিবর্তন করে তাঁকে ইবতেদায়ি শিক্ষক হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই ভুল সংশোধনের জন্য এনটিআরসিএতে (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষে) কাজ চলছে। পদবি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে বেতন নিতে বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি তা নিতে রাজি না হওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। সোমবার সকালে দায়িত্ব পালন করতে মাদ্রাসায় এলে তাঁকে অবরুদ্ধ করা হয়।
অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষক আতাউর রহমান জানান, মাদ্রাসা সুপার অফিস সহকারীকে ইবতেদায়ি শিক্ষক হিসেবে পদায়ন করায় প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী বেতন পাচ্ছেন না। তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত এই সমস্যার সমাধান চেয়েছেন। সুপারের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁরা কেন বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত হবেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কামাত আঙ্গারিয়া দাখিল মাদ্রাসাটি ১৯৮৫ সালে এমপিওভুক্ত হয়। বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এই মাদ্রাসায় ২১৯ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে এবং মোট শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা ১৮ জন। উল্লেখ্য, গত ২৩ জুলাই এনটিআরসির নিবন্ধন সনদ জালিয়াতির মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সুপার সাইদুর রহমান, যিনি বর্তমানে জামিনে মুক্ত রয়েছেন।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেব নাথ মুক্তকণ্ঠকে জানান, মাদ্রাসাটির সুপারকে অবরুদ্ধ করার বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সমস্যা সমাধানে মাদ্রাসার সভাপতিকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।