দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ বিরাজমান এই সময়ে সাভারের আশুলিয়ায় বিদেশি যৌথ বিনিয়োগে পরিচালিত একটি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকের ক্যাপ কারখানায় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র বিরোধ দেখা দিয়েছে। কারখানার দখল চেষ্টার অভিযোগ তুলেছে এক পক্ষ, অন্যদিকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক দাবি করেছেন যে তার কাজে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং কারখানায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও দ্বন্দ্বে উভয় পক্ষই আশুলিয়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন এবং সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।
সোমবার (২ নভেম্বর) বিকেলে আশুলিয়া থানার নবীনগর স্মৃতিসৌধ পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ সোহাগ এই ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৩১ অক্টোবর সকালে। সাভারের আশুলিয়ার চারিগ্রাম মির্জানগরে অবস্থিত ‘পিক হেডওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস বিডি লিমিটেড’ নামক কারখানায় এই বিরোধের সূত্র ধরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান খান এককভাবে এই কারখানাটি পরিচালনা করে আসছিলেন। তবে ২০২৪ সালে হংকংভিত্তিক একটি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়। বর্তমানে হংকংয়ের নাগরিক ও কোম্পানিটির চেয়ারম্যান চ্যান চি ওং ড্যালেন (অ্যালেক্স), ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান খান, পরিচালক নূর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ এবং প্রোডাকশন ডিরেক্টর ফরিদ আহমেদ রবিনের যৌথ মালিকানায় কারখানাটি পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
কারখানার কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ অনুযায়ী, আগে একক স্বাক্ষরে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং অর্থ উত্তোলনের সুযোগ থাকলেও যৌথ মালিকানা ও বিদেশি বিনিয়োগ আসার পর সেই নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়। তাদের দাবি, শিল্পাঞ্চলের বর্তমান শ্রমিক অসন্তোষের পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান খান ও তার অনুসারীরা কারখানাটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
অভিযোগকারী পক্ষ দাবি করেছে যে, গত ৩১ অক্টোবর বিকেলে আতাউর রহমান খান বহিরাগত লোকবল নিয়ে কারখানায় প্রবেশ করে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। সেই সময় কারখানার কয়েকজন কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাকর্মীকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে নতুন নিরাপত্তা ইনচার্জ ও সুপারভাইজার নিয়োগ দেওয়া হয়। এই ঘটনায় কারখানায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে শ্রমিকেরা কয়েকজন ব্যক্তিকে আটকে রাখেন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এরপর থেকেই কারখানা এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান খান। আশুলিয়া থানায় দেওয়া অভিযোগে তিনি দাবি করেছেন, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সুনামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু অপর পরিচালক ফরিদ আহমেদ রবিনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা তার কাজে বাধা সৃষ্টি করছেন এবং কারখানায় বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছেন। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণেই তিনি কয়েকজন কর্মীকে বরখাস্ত করেন। আতাউর রহমানের দাবি, সেই বিরোধ থেকেই পুরো ঘটনার সূত্রপাত এবং ঘটনার সময় তার লোকজন ও অপর পক্ষের লোকজন—উভয় পক্ষই সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, প্রোডাকশন ডিরেক্টর ফরিদ আহমেদ রবিন বলেন, “আমরা বিদেশি বিনিয়োগ ও নিয়মকানুন বজায় রেখে প্রতিষ্ঠানটি সচল রাখতে চাই। কিন্তু একটি পক্ষ শ্রমিক অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে জোরপূর্বক কারখানা দখলের চেষ্টা করেছিল।”
তিনি আরও জানান, “সাধারণ শ্রমিক ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা পরিস্থিতি সামাল দিয়েছি।” এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আশুলিয়া থানায় লিখিত জিডি করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আশুলিয়া থানার নবীনগর স্মৃতিসৌধ পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ সোহাগ জানান, পিক হেডওয়্যার অ্যান্ড অ্যাপারেলস বিডি লিমিটেড কারখানায় মালিকপক্ষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ খবর পেয়ে শ্রমিকদের সহযোগিতায় পরিস্থিতি শান্ত করেছে। এ ঘটনায় দুপক্ষই থানায় অভিযোগ বা জিডি করেছে এবং পুলিশ বর্তমানে বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে।