কাচের স্বচ্ছ দেয়ালের ভেতর রঙিন মাছের অবিরাম ছোটাছুটি। কোথাও দেখা গেল মাথায় অদ্ভুত ঝুঁটি, কোথাও চোখের পাশে বেলুনের মতো ফোলা অংশ। পানির নিচে কৃত্রিমভাবে সাজানো বাগান, আবার কোথাও কাচের পাত্রে বন্দি এক টুকরো অরণ্য। এসব আকর্ষণ নিয়েই রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে তিন দিনব্যাপী ‘অ্যাকুয়ারিয়াম ফিশ ফেয়ার ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২৯ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই মেলায় ৪৫টিরও বেশি স্টলে প্রদর্শিত ও বিক্রি করা হয়েছে রঙিন মাছ, বিভিন্ন প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ এবং অ্যাকুয়ারিয়ামের সাজসজ্জার নানা উপকরণ। শুক্রবার বিকেলে মেলা প্রাঙ্গণে দেখা গেল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। কেউ ব্যস্ত ছিলেন মাছের ছবি তুলতে, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ ভিডিও কলের মাধ্যমে প্রিয়জনকে দেখালেন এই রঙিন জলজ দুনিয়া। মেলায় প্রদর্শিত বিচিত্র সব আয়োজনের কিছু বিশেষ দিক এখানে তুলে ধরা হলো।
মেলায় গাপ্পি, বেলুন মলি, ব্ল্যাক মলি, ব্লু পান্ডা, অ্যাভাটার, গোল্ডফিশ, সিকলিড, টেট্রা, অ্যাঞ্জেলফিশ, ফ্লাওয়ার হর্ন এবং পার্ল গোরামি সহ নানা জাত ও রঙের বেটা বা ফাইটার মাছের সমাহার ছিল। পাশাপাশি পাওয়া গেছে রঙিন চিংড়ি, ক্রেফিশ এবং লোনাপানির ক্লাউনফিশ। এছাড়া আরও অনেক নাম-না-জানা প্রজাতির মাছের উপস্থিতি ছিল এই প্রদর্শনীতে।
মাথায় বিশাল ঝুঁটির মতো উঁচু অংশ এবং চঞ্চল স্বভাবের ফ্লাওয়ার হর্ন মাছটি ছিল অন্যতম আকর্ষণ। কাচের পাত্রের বাইরে আঙুল নাড়ালেই মাছটি দ্রুত সেদিকে ছুটে আসছিল। আকারভেদে এই মাছগুলোর দাম ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল।
২০০৩ সালের জনপ্রিয় অ্যানিমেশন সিনেমা ‘ফাইন্ডিং নিমো’র সেই বিখ্যাত কমলা-সাদা ক্লাউনফিশও ছিল মেলায়। অ্যাকোয়া টেক বিডির স্টলে কমলা ও কালো রঙের এক জোড়া ক্লাউনফিশের দাম রাখা হয়েছিল ১৪ হাজার টাকা। এই মাছগুলোর সৌন্দর্য দেখে অনেক দর্শনার্থী ছবি তুলতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
মুখের দুই পাশে বেলুনের মতো দুটি থলে বিশিষ্ট বিচিত্র চেহারার মাছের নাম বাবল আই গোল্ডফিশ। সোনালি ও লাল রঙের এই মাছগুলো দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
মেলায় আরও একটি চমক ছিল ‘২৪ ক্যারেট গোল্ড’ নামের মাছ। তবে এটি কোনো সোনার গয়না নয়, বরং ঝকঝকে সোনালি রঙের এক প্রজাতির অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছ। এই ‘২৪ ক্যারেট গোল্ড’ নামের এক জোড়া মাছের দাম ছিল মাত্র ৪০০ টাকা।
ছোট ছোট কাচের পাত্রে লাল, গোলাপি, বাদামি ও সাদা রঙের ক্রেফিশ প্রদর্শিত হচ্ছিল, যা দেখতে অনেকটা গলদা চিংড়ির মতো। যেখানে দেশি ছোট চিংড়ির জোড়া ৭০ টাকায় পাওয়া যায়, সেখানে এই রঙিন ক্রেফিশের দাম ছিল তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা।
মেলায় এক জোড়া গাপ্পিসহ কিছু প্রজাতির মাছ মাত্র ৫০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছিল। তবে আমদানি করা বিশেষ জাতের সাদা, বাদামি ও ছোপযুক্ত মলির এক জোড়ার দাম ছিল সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা।
মাছের পাশাপাশি মেলায় শামুকেরও বাজার ছিল। অ্যাকুয়ারিয়ামের কাচ বেয়ে ওঠানামা করা এই শামুকগুলো যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি কিছু প্রজাতি অ্যাকুয়ারিয়ামের শেওলা পরিষ্কার রাখতে সহায়ক। একেকটি শামুকের দাম ছিল মাত্র ২০ টাকা।
কিছু স্টলে মাছের বদলে শুধুমাত্র জলজ উদ্ভিদ রাখা হয়েছিল। অ্যাকুয়ারিয়াম সাজানোর জন্য এসব গাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মেলায় এক আঁটি জলজ উদ্ভিদ ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
পানির নিচে গালে হাত দিয়ে বসে থাকা একদল তরুণীর প্রতিকৃতি দেখা গেল। আদতে এগুলো মানুষের আদলে তৈরি টব, যার মাথার চুলের জায়গায় গজিয়েছে সবুজ গাছ এবং পানিতে দুলছে সেই পাতা। গাছসহ এমন প্রতিটি টবের দাম ছিল ৫০০ টাকা।
টাকার গাছ নয়, এখানে দেখা গেল ‘মাছের গাছ’। ডালে ডালে ঝুলছে কাচের বয়াম এবং তার ভেতরে সাঁতার কাটছে ফাইটার বা বেটা মাছ। অভিনব এই ‘ফাইটার ট্রি’র দাম রাখা হয়েছিল ৫ হাজার টাকা।
কাচের পাত্রের ভেতর পাহাড়, ঝরনা, নদী আর সবুজের সমারোহে তৈরি করা হয়েছিল ছোট এক প্রাকৃতিক দৃশ্য। মেলায় এমন টেরারিয়াম ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের আদলে তৈরি কাচের সাজসজ্জার দাম ছিল ৭০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা।
মাছের পাশাপাশি মাংসাশী উদ্ভিদের সংগ্রহও ছিল মেলায়। পাঁচ ধরনের পোকাখেকো উদ্ভিদ দিয়ে সাজানো একটি টেরারিয়ামের দাম চাওয়া হচ্ছিল ২২ হাজার টাকা।
এছাড়া অ্যাকুয়ারিয়াম ও টেরারিয়াম সাজানোর প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন ছোট-বড় পাথর, বালু, মাটি, মস এবং ড্রিফটউড বা শুকনা কাঠ খুচরা ও পাইকারি দরে বিক্রি করা হচ্ছিল।
ইনডোর গাছের স্টলেও দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। বিশেষ করে গোলাপি রঙের ছোট ছোট ফলভরা একটি ফাইকাস বনসাই সবার নজর কাড়ে। চায়না বট নামে পরিচিত এই বনসাইয়ের দাম হাঁকা হচ্ছিল ৫৫ হাজার টাকা।
রঙিন মাছের পাশাপাশি পাখির স্টলও ছিল মেলায়। বাজরিগার ও লাভবার্ডসহ নানা প্রজাতির পাখির দাম ছিল ৬০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অনেক শিশু পাখি হাতে নিয়ে ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছে।
মেলায় সবচেয়ে বেশি কৌতূহল ছিল শিশুদের মধ্যে। আজিমপুর থেকে মা-বাবার সঙ্গে আসা দুই ভাইবোন আজমাঈন ও মুনতাহা মাছ দেখে মুগ্ধ হয়ে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে কথা বলছিল, আর সেই মুহূর্তটি মুঠোফোনে ধারণ করছিলেন তাদের বাবা।
যারা এই মেলায় যেতে পারেননি, তাদের জন্য আরও একটি সুযোগ রয়েছে। আগামী ৫ থেকে ৮ নভেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের অ্যাবাকাস কনভেনশন সেন্টারে বসছে ‘বাংলাদেশ অর্নামেন্টাল ফিশ ফেয়ার অ্যান্ড শো ২০২৬’। চার দিনের এই মেলা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলবে। এতে প্রবেশ ফি লাগবে না এবং রঙিন মাছ, অ্যাকুয়ারিয়াম ও নানা সরঞ্জাম দেখার ও কেনার সুযোগ থাকবে।