শাহরুখ খান সম্পর্কে যেকোনো আলোচনা শুরু হয় তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রবল আকর্ষণ দিয়ে এবং শেষ হয় তাঁর সেই মুগ্ধ করা হাসির প্রশংসায়। তবে এই দুইয়ের মাঝে মিশে থাকে তাঁর স্টাইলের এক অনন্য গল্প। তাঁর ফ্যাশন সেন্স ঠিক তাঁর সংলাপের মতোই কালজয়ী: ‘বড় বড় দেশে এমন ছোট ছোট ঘটনা ঘটতেই থাকে, সেনোরিটা।’ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শাহরুখ খান কেবল বক্স অফিস শাসনই করেননি, বরং একজন নায়কের ফ্যাশন ও স্টাইলের সংজ্ঞাকে নতুন করে বদলে দিয়েছেন। ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে (ডিডিএলজে)’ সিনেমার সেই পাশের বাড়ির ছেলেটি থেকে শুরু করে ‘ডন’ সিনেমার আকর্ষণীয় গ্যাংস্টার কিংবা মেট গালায় নজরকাড়া অভিষেক—প্রতিটি পর্যায়েই বিবর্তিত হয়েছে শাহরুখের ফ্যাশন। আজ ৬১ বছরে পা দিলেন শাহরুখ খান। এই বিশেষ মুহূর্তে ফিরে দেখা যাক পর্দায় তাঁর এমন কিছু স্মরণীয় ফ্যাশন–মুহূর্ত, যা এই অঞ্চলের তরুণদের কাছে ফ্যাশনের অন্যতম প্রধান ভাষায় পরিণত হয়েছে।
শুরুতেই আলোচনা করা যাক ‘ডিডিএলজে’ সিনেমাটি নিয়ে। যে চলচ্চিত্রটি শাহরুখকে আজীবন মনে রাখার পথে প্রথম ধাপটি এগিয়ে দিয়েছিল। এই সিনেমায় রাজ চরিত্রের পোশাক হিসেবে চামড়ার জ্যাকেট, ডেনিম, বেসবল ক্যাপ এবং স্টাইলিশ টি-শার্ট দক্ষিণ এশিয়ার একটি পুরো প্রজন্মের তরুণদের ফ্যাশনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
রাজ চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকেরা বলিউডে এক নতুন ধরনের নায়কের দেখা পান, যিনি বাইরে থেকে আধুনিক ও পশ্চিমা ধাঁচের হলেও ভেতরে ছিলেন পুরোপুরি দেশি। পরবর্তী সময়ে কেবল সাধারণ মানুষই নন, বলিউডের নতুন প্রজন্মের নায়কদের ফ্যাশনেও এই স্টাইলটি অনুসরণীয় হয়ে ওঠে।
শাহরুখের পোশাক সংগ্রহের তালিকায় চামড়ার জ্যাকেটের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। ‘ডিডিএলজে’ সিনেমার বাদামি জ্যাকেট থেকে শুরু করে ‘জোশ’ সিনেমায় তাঁর রুক্ষ বাইকার-অনুপ্রাণিত লুক—সবখানেই চামড়ার জ্যাকেটের দাপট দেখা গেছে। কালো ভেস্ট ও ছেঁড়া জিনসের সঙ্গে বাদামি লেদার জ্যাকেট পরেছিলেন তিনি। এভাবেই তিনি বারবার ‘কুল স্টাইল’কে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
এরপর আসে ‘ডন’ সিনেমার কথা। সত্তরের দশকের একটি চরিত্রকে আধুনিক আকর্ষণে নতুনভাবে পর্দায় হাজির করেন শাহরুখ। সেখানেও ছিল চামড়ার পোশাকের আধিপত্য। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছিল তাঁর লম্বা ট্রেঞ্চ কোট এবং চামড়ার গ্লাভস।
কালো স্যুট হয়ে উঠেছিল তাঁর আরেকটি সিগনেচার স্টাইল। খুব বেশি চেষ্টা না করেও কীভাবে ক্ষমতা ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটানো যায়, তা তিনি এই পোশাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এমনকি লম্বা চুলে কমলা রঙের জেলখানার পোশাকেও তৈরি হয়েছিল তাঁর এক বিশাল ভক্তগোষ্ঠী।
কেবল সিনেমার পর্দাতেই নয়, বাস্তব জীবনেও চামড়ার জ্যাকেটের প্রতি শাহরুখের ভালোবাসা অত্যন্ত স্পষ্ট। বিমানবন্দরে যাতায়াত, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপচারিতা কিংবা সাধারণ ঘোরাঘুরি—বিভিন্ন সময়েই তাঁকে লেদার জ্যাকেটে দেখা গেছে।
চামড়ার জ্যাকেটের গল্প ছেড়ে এবার আসা যাক অন্য প্রসঙ্গে। ভারতে সোয়েটশার্ট কীভাবে ফ্যাশনেবল হয়ে উঠল, তার ইতিহাস খুঁজতে গেলে সম্ভবত পৌঁছে যেতে হবে ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায় (কেকেএইচএইচ)’ সিনেমায়।
মনে আছে সেই ‘GAP’লেখা সোয়েটশার্ট, আইকনিক পেনড্যান্ট আর একদিকে কাত করে পরা বেসবল ক্যাপের কথা? রাহুলের পোশাক ছিল তখনকার প্রায় সব কিশোরের স্বপ্নের তালিকায়।
সিনেমায় পরিচালক করণ জোহর ও ডিজাইনার মনীশ মালহোত্রা শাহরুখকে পরিণত করেছিলেন নব্বই দশকের ফ্যাশন আইকনে। তবে এই স্টাইলকে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তুলেছিল শাহরুখের নিজস্ব আত্মবিশ্বাস।
নতুন শতাব্দীতে পদার্পণের পর শাহরুখের ফ্যাশনে দেখা যায় আরও পরিশীলিত এক রূপ। ‘কাভি আলবিদা না কহনা (কেএএনকে)’ ও ‘কাভি খুশি কাভি গাম (কেকেকেজি)’ সিনেমায় তাঁকে দেখা যায় ফিটেড ব্লেজার, ট্রেঞ্চ কোট ও কালো টার্টলনেক পরতে। বিশেষ করে, তাঁর স্টাইলের মধ্য দিয়ে এই ছবিগুলোতে পশ্চিমা ফ্যাশনকে এই অঞ্চলে অনেক বেশি সহজ ও স্বাভাবিক করে তুলেছিলেন তিনি।
এরপর ‘ডিয়ার জিন্দেগি’ সিনেমায় লিনেনের পোশাকে শাহরুখের অনায়াস উপস্থিতি আবারও আমাদের সহজ-সরল ফ্যাশনের প্রেমে পড়তে বাধ্য করে। পোশাকে শান্ত রঙের ব্যবহার তাঁর চরিত্রের ‘কুল, রুচিশীল ও কিছুটা ক্যাজুয়াল’ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে দারুণভাবে মিলে গিয়েছিল।
২০২৩ সালে ৫৭ বছর বয়সে ‘পাঠান’ সিনেমার মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় রাজকীয় প্রত্যাবর্তন করেন শাহরুখ। একই সঙ্গে বয়সভিত্তিক ফ্যাশনের প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ জানান তিনি। ‘ডন’ সিনেমার সময়কার লম্বা চুলের স্টাইল ফিরিয়ে এনেছিলেন এখানে। এর সঙ্গে ছিল কমব্যাট বুট, ছেঁড়া কার্গো প্যান্ট ও হাতাকাটা চামড়ার জ্যাকেট। শাহরুখকে দেখে মনে হয়নি তিনি বয়সের তুলনায় কুল থাকার চেষ্টা করছেন; বরং তিনি যে স্বাভাবিকভাবেই স্টাইলিশ, সেটাই প্রমাণ করেছেন।
আন্তর্জাতিক তারকাদের ফ্যাশনের অন্যতম প্রধান প্রদর্শনী হিসেবে পরিচিত মেট গালা অনুষ্ঠানে ২০২৫ সালে অংশ নেন শাহরুখ খান।
বিখ্যাত ভারতীয় ডিজাইনার সব্যসাচী চেয়েছিলেন তাঁর পোশাকের মধ্য দিয়ে শাহরুখের আন্তর্জাতিক তারকাখ্যাতি ফুটিয়ে তুলতে। তাই পশ্চিমা ও ভারতীয় ড্যান্ডি স্টাইলের মিশেলে তৈরি করেছিলেন শাহরুখের জন্য বিশেষ এক লুক।
গলায় একাধিক চেইনের স্তর, সঙ্গে সিগনেচার ‘কে’লেখা পেনড্যান্ট—সব মিলিয়ে এমন এক ফ্যাশন–মুহূর্ত তৈরি করেছিলেন, যা বহু বছর মনে রাখবেন ফ্যাশনপ্রেমীরা।