কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সমন্বয়ে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘গ্যাপ’ সম্প্রতি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের কাছ থেকে মুক্তির অনুমতি লাভ করেছে। এই বিশেষ উপলক্ষ্যে গতকাল শনিবার ঢাকার মহাখালীর এসকেএস টাওয়ারে অবস্থিত স্টার সিনেপ্লেক্সে ছবিটির একটি বিশেষ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রিয় ইউটিউবার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদির। প্রদর্শনী শেষে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বর্তমান সরকার, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ব্যক্তিগত জীবনের সংকট এবং ভবিষ্যতে দেশে কাজ করার পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকেরা যখন দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর মতামত জানতে চান, তখন সালমান মুক্তাদির বলেন, ‘সরকারকে কিছু বলার মতো কোনো সুযোগ এখনো আমাকে দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। খুব আন্তরিকতার সঙ্গে প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাইনি। তাই আমার মনে হয়, আমি কিছু বললেও তা শোনার মতো কোনো সুযোগ তৈরি হবে না।’
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বা দায়িত্বশীলদের কথা বলাই শ্রেয়। তিনি বলেন, ‘যাঁদের এ বিষয়ে কথা বলা উচিত, তাঁরা যদি কথা বলেন, সেটাই ভালো। আমরা সাধারণ নাগরিকেরা কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা নিতে পারি। সেই অভিজ্ঞতা ভালোও হতে পারে, খারাপও হতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে কিছু বললাম কি বললাম না, তাতে আসলে কোনো পার্থক্য তৈরি হয় না। বড়জোর কিছু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ হয় অথবা সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।’
নতুন কোনো বার্তা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সালমান জানান, বর্তমান সময়ে মানুষ এমনিতেই অনেক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘না, নতুন কোনো বার্তা দেব না। পুরোনোগুলো জমতে জমতে মানুষের মধ্যে অনেক বাজে একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, সবাই অনেক হতাশ। তাই নতুন করে কিছু দিয়ে মানুষকে আর বেশি চাপের মধ্যে ফেলতে চাই না।’
পারিবারিক জীবন এবং স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে সালমান বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা খুবই করুণ একটা অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। একটা বড় বিপদ অতিক্রম করার চেষ্টা করছি। আমার কষ্ট হয়েছে, ক্ষতিও হয়েছে—এটা সত্যি। কিন্তু এ নিয়ে আমি খুব একটা দুঃখী কি না, তাহলে বলব, একদমই না। আমি দুঃখ প্রকাশ করে বসে থাকতে পছন্দ করি না।’
জীবনযুদ্ধের প্রতিকূলতা জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি সব সময় চেষ্টা করি, জীবনে যদি ভালো কিছু চাই, তাহলে খারাপ কিছুর জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। তাই খারাপ সময় যখন আসবে, সেটাকে অতিক্রম করতে হবে। এটা নিয়ে অভিযোগ করে বসে থাকলে তো হবে না।’
পেশাগত জীবনে স্ত্রীর সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, জীবনসঙ্গীর সমর্থন ছাড়া বড় হওয়া কঠিন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, প্রত্যেক জীবনসঙ্গীর ক্ষেত্রেই—সে স্বামী হোক বা স্ত্রী, একজন আরেকজনকে সাহায্য না করলে আসলে কেউ একা বড় হতে পারে না। তাই এটা দুজনের জন্যই সমান। একটা সম্পর্ক কখনোই একজনকে দিয়ে হয় না, দুজনেরই সমান ভূমিকা থাকে।’
সম্প্রতি তাঁকে ঘিরে আলোচিত কিছু ঘটনার সঙ্গে তাঁর শ্বশুরের নাম জড়িয়ে আসার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সালমান বলেন, ‘জন্ম কে দিয়েছে, সেটা তো আমি আসলে জানি না। কিন্তু ঘটনাটা যখন ঘটেই গেছে, তখন আমি যে গিয়ে জিজ্ঞাসা করব, কোথা থেকে কী হলো, সেই সুযোগটাও তো পাইনি। আগেই বলেছি, আমি সেই সুযোগ পাইনি। আমি তো বলেছি, আমি দোষী। তো যাঁরা আমাকে দোষ দিচ্ছেন, তাঁরা যদি সবাই মিলে আমাকে সামনে বসিয়ে একটু কথা বলতেন, তাহলে দোষটা স্বীকার করে বিষয়টা সমাধান করতে তো সমস্যা হতো না। কিন্তু তা না করে কেউ একটা কিছু বলে দিলেন, আপনারা সেটা ছড়িয়ে দিলেন, অথচ প্রমাণ করতে পারলেন না। শুধু একটা অভিযোগ করে দিলেন।’
এ ধরনের সামাজিক ও ব্যক্তিগত সংকট একজন মানুষের ক্যারিয়ার ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, নিজের মধ্যে এটা মোকাবিলা করার ক্ষমতা আছে বলেই আমি পরিস্থিতিটা সামলাতে পারছি। কিন্তু অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা এটা সামলাতে পারেন না। তাঁদের জীবন শেষ হয়ে যায়, সুনাম চলে যায়, ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যায়। তাঁরা তো আর আমার মতো পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারেন না। তাঁদের জীবনটাই হয়তো আর স্বাভাবিকভাবে এগোয় না। এই মানুষগুলোর কাছে আমাদের সবার জবাবদিহি থাকা উচিত। এ ধরনের ঘটনায় আমাদের সবারই একটা দায়িত্বশীলতা থাকা দরকার।’
জনপ্রিয়তার নেতিবাচক দিকগুলো মেনে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কারও ক্ষতি করার চেয়েও বড় কথা হলো, আমরা বিষয়টা কীভাবে সামলাচ্ছি। যদি আমরা এটাকে খুব ব্যক্তিগতভাবে নিয়ে ভাবি, আমার সঙ্গে এমনটা হওয়া উচিতই নয়, তাহলে সেটা বড় ভুল হবে। কারণ, ক্যামেরার সামনে এসে যখন আমরা জনপ্রিয়তা পাই, অনেক অনুসারী হয়, তখন আমরা সব সময় এর ভালো দিকগুলোই চাই। খ্যাতি থাকবে, টাকাপয়সা থাকবে, জনপ্রিয়তা থাকবে। কিন্তু এর সঙ্গে যখন নেতিবাচক কিছু আসে, সেটাও আমাদের মেনে নিতে হবে। এমন তো হতে পারে না যে আমি ভালো দিকটা নেব, কিন্তু খারাপ দিকটা নেব না।’
জীবনদর্শন সম্পর্কে তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, পৃথিবীর নিয়মই এমন—সব সময় ভালো কিছু ঘটবে না, খারাপ সময়ও আসবে। জীবনের অন্য যেকোনো বিপদের মতো সেই সময়গুলোও অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’
সবশেষে, স্টুডিও ভাঙার ঘটনার পর দেশ ত্যাগের গুঞ্জন এবং ভবিষ্যতে দেশে কাজ করার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সালমান মুক্তাদির স্পষ্টভাবে জানান, তাঁর দেশে থাকার কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, ‘না, দেশে থাকার পরিকল্পনা কখনোই ছিল না। আগেও ছিল না। স্টুডিও ভাঙার ঘটনার পর আমি বলেছি, বাংলাদেশে আর স্টুডিওটা চালিয়ে যাব না। এটা আসলে আমার নিজের মতামত, আমার একটা বক্তব্য ছিল। আমি বাংলাদেশে আর বিনিয়োগ করব না।’