মিডিয়া জগতে প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, সহকর্মীদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয় না। মনে করা হয়, এখানে সবাই একে অন্যের সহযোগী হওয়ার চেয়ে প্রতিযোগী হিসেবেই বেশি সক্রিয়। তবে অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব, অভিনেত্রী সাফা কবির এবং মুমতাহিনা টয়ার ক্ষেত্রে গল্পটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সম্প্রতি এই তিন বন্ধু একসঙ্গে সিলেটের লালাখালে ভ্রমণে গিয়েছিলেন। তাঁদের সেই আনন্দময় ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন মনজুরুল আলম।
গত ২৭ অক্টোবর ছিল অভিনেতা তৌসিফ মাহবুবের জন্মদিন। তৌসিফ জানান, সাধারণত প্রতি বছর জন্মদিনের সময়েই তাঁর কোনো না কোনো কাজের চাপ থাকে। শুটিং এবং নানা ব্যস্ততার কারণে দিনটি কাটে, যার ফলে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ খুব একটা মেলে না। এই পরিস্থিতি এড়াতেই এবার আগে থেকে শুটিংয়ের কাজ বন্ধ রেখেছিলেন তিনি। তৌসিফের মতে, ঢাকায় থাকলে কেউ না কেউ কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত করে ফেলে। তাই এবার তিনি স্ত্রী ও বন্ধুদের সঙ্গে দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন।
তৌসিফ বলেন, “এবার জন্মদিনে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, পেরেছি। নিজের মতো করে ঘুরেছি; আর যেহেতু বন্ধুরা সব সময় জন্মদিনে পাশে থাকে, সে কারণে তাঁদের জানিয়েছিলাম, আমার সঙ্গে যাবে কি না। রাজি হয়ে গেল সাফা, টয়া ও সিয়াম (আহমেদ)। ব্যস্ততার কারণে আসতে পারেনি সিয়াম। ব্যস্ততার ফাঁকে নিজেদের মতো করে আড্ডা–গানে সময় কাটিয়েছি।”
সিলেটের লালাখাল তৌসিফের কাছে অত্যন্ত স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থান। এখানে তাঁর গানের ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটেছিল এবং শুরু হয়েছিল নাটকের ক্যারিয়ার। এই স্মৃতিচারণ করে তৌসিফ বলেন, “তখন আমাদের ব্যান্ড ছিল। গান করতাম। ঢাকার বাইরে কনসার্ট থাকত। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে এই লালাখাল থেকে গান করে, সারা রাত বাসে জার্নি করে ঢাকার বাসায় ফিরি; আর ফিরেই ভোর চারটার দিকে আমার ক্যারিয়ার শুরুর নাটক অলটাইম দৌড়ের ওপর নাটকের শুটিংয়ে আবার এই লালাখালে এসেছিলাম। এই জায়গা একটি ক্যারিয়ারের শেষ আর আরেকটির শুরু। যে কারণে জায়গা স্মৃতিকাতর করেছে।”
বন্ধুদের সঙ্গে ভ্রমণের এমন সুযোগ কখনোই হাতছাড়া করতে চান না সাফা কবির। প্রস্তাব পাওয়ার সাথে সাথেই তিনি রাজি হয়ে যান। সাফা জানান, আদনান আল রাজীবের ‘অলটাইম দৌড়ের ওপর’ নাটকের শুটিং চলাকালীন তৌসিফের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বের শুরু। অন্যদিকে, ‘সুপার গার্লস’ ধারাবাহিক নাটকের শুটিংয়ের সময় মুমতাহিনা টয়ার সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। বর্তমানে তাঁরা দুজনই তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে গিয়ে সাফা বলেন, “দারুণ একটা ট্যুর ছিল। আমি লালাখালের এমন নীল পানি সেন্ট মার্টিন ছাড়া আর কোথাও দেখিনি। পরিবেশটা অসাধারণ। বিশেষ করে এখানে এসে প্রকৃতির সঙ্গে দারুণ সময় কেটেছে। আমি আর টয়া সকালে ঘুম থেকে উঠে সূর্যোদয় দেখেছি, ঘুরেছি। সিয়ামকে মিস করলাম। তাঁকে সুন্দর মুহূর্তের ভিডিও পাঠালাম। আমার কাছে এটা ছিল মানসিকভাবে নিজেকে তৈরি করার জার্নি। মনে হলো বয়স কমে গেছে। সময়গুলো স্মৃতি হয়ে থাকবে। ভাবছি, প্রতিমাসে একবার এখানে আসতে পারলে এটা আমার জন্য প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবে কাজ করত।”
ভ্রমণের তিন দিন ধরে তৌসিফ ও টয়া মূলত সাফাকে নিয়েই মেতে ছিলেন। মজার সব জোকস আর আড্ডায় তাঁদের সময় কেটেছে দারুণভাবে। হাসির চোটে তাঁরা ঠিকমতো ছবিও তুলতে পারেননি। এই ভ্রমণে টয়ার সঙ্গে তাঁর স্বামী অভিনেতা সৈয়দ জামান শাওনও উপস্থিত ছিলেন। টয়া বলেন, “বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার সময় সুন্দর পোজ দেওয়ার চেয়ে হাসি থামানো অনেক বেশি কঠিন। শেষ পর্যন্ত সুন্দর পোজের চেয়ে হাসতে হাসতে তোলা ছবির সংখ্যাই বেশি হয়; কিন্তু মজার ব্যাপার হলো—পরে এই ছবিগুলো দেখেই সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে।” একই অনুভূতি প্রকাশ করেন সাফা। তিনি বলেন, “আমরা সব সময় অনেক আনন্দে ছিলাম। হাসি–ঠাট্টা করেছি। সেসব ছবিও ফেসবুকে দিলাম। সবাই পছন্দ করেছে। এখন ভয় হচ্ছে, আমাদের আবার কেউ নজর না দেয়।” কথাটি বলে হাসেন এই অভিনেত্রী।
সাফা কবির জানান, তাঁদের এই বন্ধুত্ব এক দশকেরও বেশি পুরনো। দীর্ঘ এই সময়ে সম্পর্কের মাঝে উত্থান-পতন থাকলেও তা তাঁদের বন্ধন আরও দৃঢ় করেছে। তিনি বলেন, “একদমই শুরু থেকে আমাদের হয়তো কিছু বিষয় নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হতো; কিন্তু সেটি সম্পর্ককে সত্যকার একটা জায়গায় নিয়ে গেছে। এখন আমরা বন্ধুর চেয়েও অনেক বেশি কিছু। বলা যায়, পরিবারের অংশ। টয়া, তৌসিফ, সিয়াম আমার কাছে স্পেশাল।”
তৌসিফ মাহবুবের মতে, এই বন্ধুরা তাঁর জন্য আস্থার এক নিরাপদ আশ্রয়। তিনি জানান, অনেক বন্ধু থাকে, কিন্তু এরা সম্পূর্ণ আলাদা। তৌসিফ বলেন, “নানাভাবে ওরা বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে। যেমন বিমান থেকে নামার সময় ওরা আমাকে লাগেজ নেওয়ার দায়িত্ব দিল। এ সময়ে ওরা আমার জন্য সিলেট শহর থেকে কেকসহ সারপ্রাইজিং বেশ কিছু জিনিস নিয়েছে। আমি কিছুই জানতাম না। আমাদের মধ্যে সব সময় সারপ্রাইজ দেওয়ার চেষ্টা থাকে।” সিলেট থেকে ফেরার পরপরই তাঁরা পুনরায় শুটিংয়ের ব্যস্ততায় ফিরে গেছেন।